সংবাদ শিরোনাম
জগন্নাথপুরের মিরপুর ইউনিয়ন নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট গ্রহণ শুরু  » «   দিরাইয়ে ৫ বছরের এক শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা  » «   সিলেট জেলায় শ্রেষ্ঠ হলেন গোয়াইনঘাট সার্কেলের এএসপিসহ ৪ পুলিশ কর্মকর্তা  » «   ক্রসফায়ারে হত্যার চেষ্টা.এতে ব্যর্থ হয়ে ডাকাতির মামলায় ঢুকান জকিগঞ্জের ওসি  » «   সুইসাইড নোট থেকেই জানা গেলো আত্মহত্যা করা পপি গণধর্ষণের শিকার  » «   সাংবাদিক মনোয়ারা মনু আর নেই  » «   আবরার ইস্যুতে বিবৃতি দেয়ায় জাতিসংঘ দূতকে তলব  » «   ২২ দিন কোচিং সেন্টার বন্ধ রাখার নির্দেশ-ডা. দীপু মনি  » «   বৃটেনে প্রতারণার আশ্রয় নিতে গিয়ে ফেঁসে গেলেন নাসরিন  » «   বিশ্ব মান দিবস আজ  » «   শেখ হাসিনার অ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে : কাদের  » «   শ্রীমঙ্গল উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন আজ  » «   ৩য় শ্রেণীর ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে এনা বাসের সুপার ভাইজার গ্রেপ্তার  » «   কানাইঘাট থেকে ১৪ মন ভারতীয় চা পাতা উদ্ধার  » «   সীমান্তে হত্যাকাণ্ড কমে গেছে যারা মারা যাচ্ছে তারা চোরাকারবারি.পররাষ্ট্রমন্ত্রী  » «  

সুবর্ণ গ্রামের রূপকথা

8ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)::

কৈফিয়ত এক:

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় নিয়মিত দেয়ালিকা বের করতাম। সাথে ইমন, দুলাল, আরিফ আর পরে যোগ দেয় মামুন। নাম ছিল  ‘চৌরত্ন’। এরা প্রত্যেকে এখন যার যার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। দেয়ালিকার অভিজ্ঞতা অবশ্য আমাদের জন্য খুব একটা সুখকর ছিল না। যেমন সম্ভবত ১৯৯২ সালের কথাই ধরুন। সকাল আটটার দিকে লেকচার ক্লাস শুরু হতেই গ্যালারির সামনে দেয়ালিকাটা টানিয়ে আমরাতো রীতিমত মুগ্ধ। দেয়ালিকাটার নাম ‘আসে ছাগল যায়… …’।

গত ছ’সাত দিনের রাত জাগা, হাড় ভাঙা খাটুনি এক নিমেষেই নাই হয়ে গেল। আজকের দিন হলে নির্ঘাত সেলফি তুলে ফেসবুকে পোস্ট দিতাম। দেয়ালিকাটির বিষয়বস্তুও এর নামের মতই চমকপদ। প্রায় এক মাস ধরে এর জন্য লেখা লিখেছিলাম আমি আর একরাম। আর অদ্ভুত যত্নে সেগুলো গোটা গোটা অক্ষরে লিখেছে মামুন আর দুলাল। ইমন, দুলাল, মামুন আর আমি সেগুলো সেটেছি দেয়ালিকায় বসানো সারি সারি শোলার ছাগলের গায়ে।

দেয়ালিকাটির মূল প্রতিপাদ্য ছিল ১৯৭৫-এর পর থেকে দফায় দফায় এদেশ শাসন করেছে উর্দিধারী কিংবা উর্দিবিহীন ‘ছাগলরাই’। বিষয়বস্তুর যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে যেয়ে দেয়ালিকার বাম প্রান্তে একটি প্রস্থানরত ছাগলের পশ্চাৎদেশ আর ডান প্রান্তে প্রবেশরত আরেকটি ছাগলের মাথাও সেটে দেয়া ছিল। এক কথায় যাকে বলে অসাধারণ একটা দেয়ালিকা।

দেয়ালিকাটা টানিয়ে ক্যান্টিনে বসে চায়ের কাপে তৃপ্তির চুমুক দিয়ে সিগারেটটা মাত্র ধরিয়েছি, হৈ চৈ শুনে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে আসতেই শুনতে পেলাম ছাত্রদলের বন্ধুরা এরই মধ্যে আমাদের সাধের দেয়ালিকার দফারফা সাঙ্গ করেছে। তারপর? তারপর আর কি- ছাত্রদলের ধাওয়ায় ‘বেন জনসনের দ্রুততায়’ আমরা সবাই চরপাড়ায় আমাদের আখরায়।

নব্বইয়ে গণতান্ত্রিক শাসনে উত্তরণের পর হোস্টেল থেকে বহিষ্কৃত বিভিন্ন ব্যাচের আমরা যে কজন ছাত্রলীগের ধ্বজাধারী তখনও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে স্বাধীনতার স্বপক্ষের ঝাণ্ডা বয়ে বেড়াতাম, ময়মনসিংহ শহরের এই চরপাড়ার পাশাপাশি কয়েকটা ভাড়া বাসায় ছিল তখন আমাদের আস্তানা আর চরপাড়া মোড়ের কাছে লিটনের ছাপরা চায়ের দোকানটা ছিল আমাদের ‘হোস্টেল ক্যান্টিন’। ধাওয়া খেয়ে আসার পর  লিটনের দোকানে আড্ডাটা খুব একটা জমলো না। ছাত্রদলের বন্ধুদের আবদার মেটাতে গিয়ে প্রিন্সিপাল স্যার এরই মাঝে অনির্দিষ্টকালের জন্য কলেজ বন্ধ ঘোষণা করেছেন। অতএব তখন কোনোমতে তল্পি-তল্পা গুটিয়ে ভালোয় ভালোয় ঢাকায় ফেরার তাড়া।

কৈফিয়ত দুই:

আমি বরাবরই পুলিশ ভয় পাই। নারায়ণগঞ্জের এসপি, ঢাকা কলেজের প্রিয় বন্ধু মইন প্রতি ঈদের পরদিন তার ওখানে আনন্দ সন্ধ্যার আয়োজন করে আর আমিও প্রতিবারই ঠিক ঠিক যেয়ে হাজির হই। মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মহোদয় আমার মেজো চাচার ভায়রা, আমার প্রয়াত বাবারও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। চাচি অর্থাৎ মন্ত্রী মহোদয়ের স্ত্রী আমাকে বিশেষ আদর করেন। আদর করেন মন্ত্রী মহোদয় নিজেও। বাসায় গেলেই একটু বাড়াবাড়ি রকমেরই আপ্যায়ন করেন। তারপরও যাই না- উনাদের চারপাশে শুধু পুলিশ ঘোরাঘুরি করে যে! অতএব আমি যে ৫৭ ধারাকে ভয় পাব তাতো খুবই সঙ্গত।

লেখার শুরুতেরই দু’দুটি কৈফিয়ত দেয়ার উদ্দেশ্য আর কিছু না- আমি খুবই সহজ-সরল ধরনের মানুষ। ছাগলকে ছাগল বলতে যেয়ে নিজেই ছাগল বনে গিয়েছিলাম। তার উপর আবার ভয় পাই ৫৭ ধারা! অতএব আগেভাগেই বলে রাখি আমার এই লেখার পরবর্তী অংশে বর্ণিত কোনো ব্যাক্তি, স্থান বা কালের সাথে অন্য কারো কোনো ধরনের কোন মিল নেহায়েতই দৈবচয়ন।

প্রবন্ধ লিখতে লিখতে ইদানিং একটু যেন একঘেয়েমিতে পেয়েছে। প্রায়ই ভাবি অন্যকিছু লেখার চেষ্টা করি না কেন? ভাবতে ভাবতেই গল্প লিখতে বসা। ভাবলাম একটা রূপকথাই লিখে ফেলি। এ লাইনে লেখক নাই বললেই চলে। বলা যায় না এক-আধটু নাম-ডাকও হয়ে যেতে পারে।

সে বহুদিন আগের কথা। ডায়নোসরেরা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়েছে বটে, তবে পৃথিবীর বুকে তখনও স্টিম ইঞ্জিনের আনাগোনা শুরু হয়নি। উট আর ঘোড়ার গাড়িতেই সেকালের সম্ভ্রান্তজনেরা চলাফেরা করতেন। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেষে ছিল সাজানো-গোছানো ছোট্ট একটি জনপদ। নাম ছিল ‘সুবর্ণ গ্রাম’। সুবর্ণ গ্রামের মিষ্টি এ নামটি রেখেছিলেন দেশটির প্রথম রাজা।

আগে এর নাম ছিল ‘খানপুর’। দীর্ঘদিন দেশটি ছিল বিদেশি খান আর তাদের দেশি দালালদের শাসনে। রাজা সুবর্ণ গ্রামের শান্তিপ্রিয়, সহজ-সরল মানুষগুলোকে এক করে, দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের পর দেশটি স্বাধীন করেছিলেন। তার স্বপ্ন ছিল এই লোকগুলোর জন্য তিনি একটি ‘সোনার দেশ’  উপহার দিবেন। তাই অনেক শখ করে খানপুরের নাম পাল্টে রেখেছিলেন সুবর্ণ গ্রাম।

রাজার শাসনে সুখেই ছিল সুবর্ণ গ্রামের লোকগুলো। যুদ্ধের ক্ষত ধীরে ধীরে শুকিয়ে আসছিল। চারদিকে কেমন যেন সুখ-সুখ, শান্তি-শান্তি আবেশ। এরই মাঝে হঠাৎ করেই ছন্দ-পতন। রাজা গিয়েছিলেন সুবর্ণ গ্রামের পাঠশালা পরিদর্শনে। এই পাঠশালাটি বেশ নামকরা।

আশ-পাশের দু’দশ গ্রামের ছেলেপুলে এখানে পড়তে আসে। পাঠশালাটা ছোট একটা টিলার উপর। পরিদর্শন শেষে হুক্কা ফুঁকতে ফুঁকতে সিঁড়ি বেয়ে নামতে যেয়ে রাজা হঠাৎ পা পিছলালেন। মাথায় তার গুরুতর আঘাত। রাজবদ্যি আর তার সব সাঙ্গপাঙ্গদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে, সুবর্ণ গ্রামবাসীকে দুখের সাগরে ভাসিয়ে রাজা দু’চারদিনের ভেতর মারাও গেলেন। তবে এ নিয়ে সুবর্ণ গ্রামে নানা কানা-ঘুষা। লোকে বলাবলি করলো, খানদের দেশীয় দোসরা নাকি সিঁড়িতে ঘি ঢেলে দিয়েছিল আর তাতেই রাজা পা পিছলান।

রাজার মৃত্যুর পর সুবর্ণ গ্রামের লোকগুলো জীবন কেমন যেন বদলে গেল। প্রিয় রাজার মৃত্যুতে ঠিকমতো মাতম করার সময়ও জুটলো না তাদের। সুবর্ণ গ্রামের সিংহাসনে বসলো খানদের বংশদবদ এক রাজা। আর তার সাথে এসে জুটলো সুবর্ণ গ্রামের প্রয়াত রাজার যত অনুচর, রাজা বেঁচে থাকতে যাদের স্তুতি আর রাজবন্দনায় রাজ দরবার সবসময় সরগরম থাকতো।

সুবর্ণ গ্রামের সিংহাসনে এরপর এলো-গেলো একের পর এক কতই না রাজা। সবাই-ই খানদের দালাল। রাজা আসে, রাজা যায়- সুবর্ণ গ্রামের তাতে কিছু এসে যায় না। চারদিকে দুর্নীতি আর দমন-পীড়নের এক অস্বস্তিকর পরিবেশ। সুবর্ণ গ্রামের মানুষগুলো এক সময় যেন হাসতেও ভুলে গেল।

কিন্তু আজ সুবর্ণ গ্রামে বইছে আনন্দের জোয়ার। দীর্ঘদিন পর ভাগ্যদেবী তাদের প্রতি প্রসন্ন হয়েছেন। রাতের পরে যেমন দিন আসে, মেঘের পরে যেমন সূর্য হাসে, তেমনি তাদের সুবর্ণ গ্রামের দুর্ভোগও বোধহয় শেষ হলো। সুবর্ণ গ্রামের সিংহাসনে এসেছেন নতুন রানী। তাদের প্রয়াত রাজার কন্যা। রাজার মৃত্যুর পর রাজকন্যাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। বাবার মতই দীর্ঘ সংগ্রামের পর রাজকন্যা সুবর্ণ গ্রামে আবারো সুদিন ফিরিয়ে এনেছেন। বিদেশি খান আর তাদের দালালরা অবশেষে বোধ করি সত্যি সত্যি পরাজিত হয়েছে। মানুষের আনন্দ আর ধরে না।

রাজকন্যার শাসনে দেশ চলছিল ঠিকঠাক। সুবর্ণ গ্রামের সওদাগরেরা সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দিয়ে তাদের পন্য ছড়িয়ে দিচ্ছেন পৃথিবীময়। মাঠে খেলছে সোনালি ধান আর কৃষকের গোলা ভরছে তা দিয়ে। মেলা আর পার্বণে ভালোই কেটে যাচ্ছিল সুবর্ণ গ্রামের মানুষগুলোর দিনকাল। রাজকন্যা একাধারে তার বাবার মতো সুশাসক, পাশাপাশি তার চোখ-কানও খোলা।

সুবর্ণ গ্রামের কিছু কিছু মানুষ বেশ পশ্চাতপদ। লেখা-পড়ায়ও তাই। সংখ্যায়ও তারা সামান্যই। রাজকন্যা চান তার উন্নয়নের ছোয়া লাগুক সবার জীবনে। সুবর্ণ গ্রামের প্রতিটি মানুষ ভোগ করুক এই উন্নয়নের সুফল। তাই তিনি এই লোকগুলোর ক্ষমতায়নের ব্যাপারেও খুবই সচেতন। এই বিবেচনা থেকে তিনি সুবর্ণ গ্রামের প্রধান পাঠাগারটির প্রশাসক বানালেন তেমনি একজনকে। সুবর্ণ গ্রামের জন্য এই পদটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই পাঠাগারেই রক্ষিত আছে সুবর্ণ গ্রামের ‘দেবদূত প্রদত্ত নির্দেশাবলী’। আর প্রশাসকের অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে খানদের আর তাদের দেশীয় দোসরদের হাত থেকে এসব দেববাণীকে বাঁচিয়ে রাখা। কারণ কোনভাবে এগুলোর কোনো ক্ষতি হলে বা এগুলো চুরি হয়ে গেলে যে সুবর্ণ গ্রামের রাজ্যপাট পরিচালনা করাই অসম্ভব হয়ে পরবে। সুবর্ণ গ্রামের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অবশ্য এই নিয়োগে কোনো আপত্তি নেই। রাজকন্যা এর আগেও এমনি অনেককেই নানা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে বাসিয়েছেন আর তারা তা পালনও করেছেন যথেষ্ট নিষ্ঠার সাথেই।

তবে পাঠাগার প্রশাসকের এই নিয়োগ নিয়ে চারদিকে খুব কানাঘুষা। শোনা যায় নতুন প্রশাসক একসময় খানদের দালালি করেছেন। তিনি নাকি আবার তা বড় গলায় স্বীকারও করেন। তার কর্মকাণ্ডেও এটা বেশ স্পষ্ট। শোনা যাচ্ছে প্রশাসক নাকি নিজেই সিংহাসনে বসতে চাচ্ছেন।

বাড়ছে সুবর্ণ গ্রামবাসীর অস্বস্তি। রাজকন্যার নেতৃত্বে সুবর্ণ গ্রামের এই যে শনৈ শনৈ উন্নতি এটা মেনে নেয়া খানদের আর তাদের দেশীয় দোসরদের পক্ষে কখনোই সম্ভব না। অতএব সুবর্ণ গ্রামবাসীর এই যে নতুন অস্বস্তি তা একেবারে অমূলক বলে উড়িয়েও দেয়া যাচ্ছে না।

তারপর? তারপর একদিন সব চুপচাপ। পাঠাগার প্রশাসক কেমন যেন হঠাৎই চুপসে গেলেন। নানাজনের কাছে এর নানান ব্যাখ্যা। শোনা যায় প্রশাসকের স্বপ্নে হাজির হয়েছিলেন স্বয়ং দেবদূত। বলেছেন, ‘বৎস- অতি বাড় বেড়ো না, ছাগলে মুড়ে খাবে… …!’

নটে গাছটি মুড়ালো, আমার রুপকথাটি ফুরালো।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।

বিএইচ

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.