সংবাদ শিরোনাম
যুক্তরাষ্ট্রে মৃত মানব শরীর কম্পোস্ট করে তৈরি হবে জৈব সার  » «   বিমান বাহিনীর প্রধান হিসেবে নারীকে মনোনয়ন দিলেন ট্রাম্প  » «   ফল ঘোষণার আগেই পাঁচ বছরের পরিকল্পনা স্থির মোদির  » «   রাজধানীতে কোনও ছিনতাইকারী নেই : আছাদুজ্জামান মিয়া  » «   বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ ॥ ধর্ষক গ্রেফতার  » «   সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের ইফতার মাহফিল সম্পন্ন  » «   বদলে গেল কিলোগ্রাম মাপার প্রতীক  » «   মার্কিন সুপারস্ট্রার সেলেনার বিয়ে এই ‘বুড়ো’র সঙ্গে!  » «   বশেমুরবিপ্রবি’র ৯ শিক্ষার্থীকে আড়াই লাখ টাকা অনুদান  » «   নতুন টাকার নোট বিনিময় কার্যক্রম শুরু  » «   বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপজ্জনক ক্রিকেটার জস বাটলার  » «   কানাইঘাটে পাওনা টাকার জের ধরে ধারালো চাকুর আঘাতে গুরুতর আহত মাইক্রোচালকের মৃত্যু  » «   ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফেলে যাওয়া সেই নবজাতককে নিলেন পুলিশ দম্পতি  » «   সিলেট নগরীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভিযান-জরিমানা  » «   ঈদের আগে সিলেটে ফিটনেসবিহীন বাসের বিরুদ্ধে অভিযানে পুলিশ  » «  

বোধ

জাকিয়া সুলতানা::

গল্পটা মাথা থেকে হারিয়ে গেল। স্বপ্নে একটা সুন্দর প্লট এসেছিল মাথায়। কিন্তু ঘুম ভাঙার পর অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারল না শিহাব। কী ছিল? অনেকক্ষণ মনে করার চেষ্টা করল।

কিন্তু কিছুতেই মনে এলো না। শুধু আবছা মনে পড়ছে ওর এক বন্ধুকে নিয়েছিল গল্পের প্লটটা। হারিয়েই গেল? কি আর করা! থাক। নতুন কিছু ভাবতে হবে। তবু ঘুরেফিরে ঐ চিন্তাটাই মাথায় ঘুরে বেড়াতে লাগল। নাহ! চিন্তাটাকে আর বাড়তে দেওয়া যাবেনা। চিন্তার হাত থেকে রেহাই পেতে বেরিয়ে পড়তে গেল বাসা থেকে। যদিও আজ ছুটি। এত সকালে না বেরোলেও চলে। কিন্তু এই ফালতু ভাবনাটা থেকে বাঁচার জন্য ও বাসা থেকে বেরোতে গেল। আর ঠিক দরজার কাছে শিলা ধরে ফেলল ওকে,
-এই কোথায় যাও আমাকে না বলে!
-একটু ঘুরে আসছি। যাব আর আসব।
শিলা স্বামীর পাগলামীর সাথে ভালমত অভ্যস্ত হয়ে গেছে এ ক’বছরে। বলল,
-যাচ্ছ যখন। বাজারটাও করে এসো। মনে আছে তো আজ পিয়া আসবে ওর বরকে নিয়ে।
-হুম। ব্যাগটা দাও।
বলে আবার ঘরে ঢুকে মানি ব্যাগটা নিয়ে এল। শিলা ব্যাগ হাতে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।
-স্টার এজ মশলা আর রাঁধুনির গুঁড়া এনো কিন্তু মনে করে।
-হুম আনব।

লিফটে নীচে নামতেই দেখল বেশ বড় একটা জটলা এই সকালেই। বেশ উত্তেজিত কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে সবার। কৌতূহল নিয়ে সামনে এগোতেই যা শুনল তাতে হাসবে না কাঁদবে ভেবে পেলনা। সিকিউরিটি গার্ড রাতে ভুত দেখেছে। শিহাব এগিয়ে গেল।
-কি দেখেছ তুমি? ঠিক করে বলতো!
-স্যার দেখলাম লম্বা একজন মানুষ সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাচ্ছে।
-তোমাকে কিছু বলেনি?
-হ্যাঁ স্যার বলেছে।
-কি বলেছে?
-বলেছে এখানে আমরা ঘুমালে ওদের চলাফেরা করতে সমস্যা হয়।
সিঁড়ির নীচে গার্ডরা ঘুমায় যে রাতে যার ডিউটি থাকে। শিহাব দেখল এপার্টমেন্টের কেউ কেউ তাল দিচ্ছে বিষয়টাতে। অবাক ব্যাপার! এই যুগেও ভূত বিশ্বাস করে কেউ! গার্ড না হয় অশিক্ষিত। কিন্তু যারা ওর কথায় তাল মেলাচ্ছেন তাদের অধিকাংশই শিক্ষিত। শিহাব আস্তে করে এখান থেকে সরে পড়ল। অহেতুক সময় নষ্ট করে লাভ নেই কোন।
বাজারে পিছন দিক দিয়ে ঢুকল। এদিকটায় কাঠের কিছু দোকান আছে। তাড়াতাড়ি আসা যায় বলে এদিকটা দিয়ে এসেছে। মুরগীর দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে রীতিমত বমি এসে গেল ওর। শিলা দিনের পর দিন এই গন্ধ সহ্য করে বাজার করে কি করে! মুরগী আর গরুর মাংসের দোকানের মালিকের ফোন নম্বর আছে শিলার কাছে। ফোন করে ভাল মাংস দিতে বলে দিয়েছে। নাহলে শিহাব খুব আনাড়ি বাজার করার ব্যাপারে। কি কিনে নিয়ে যেত। শেষে ঝাড়ি খেত শিলার। মাংসের দোকানের কাজ সেরে সামনে মুদি দোকানের দিকে এগিয়ে গেল শিহাব। কি আনতে হবে একটা কাগজে লিখে দিতে বলেছিল বেরনোর আগ মুহূর্তে। সেটা এগিয়ে দিতেই দোকানের কর্মচারীটা মিলিয়ে দিয়ে দিল। বাকী বাজার গতকাল শিলাই করে রেখেছে। আবার ফিরতি পথ ধরল। মাংসের দোকান পার হওয়ার পর শুঁটকী মাছের দোকান। এই জায়গাটা প্রায় নাক বন্ধ করে পার হল।
এপার্টমেন্টের নীচে জটলাটা এখনো আছে। মানুষ পারেও। এবার কাউকে কিছু না বলে লিফটে উঠে গেল। বাসার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বুঝল পিয়া এসে গেছে। পিয়া ওর চাচাতো বোন। শিহাবের উপর একটা দুর্বলতা ছিল পিয়ার। শিহাব বুঝলেও ব্যাপারটাকে একেবারেই গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু পিয়া নাছোড়ের মত লেগে ছিল অনেকদিন। শেষে শিহাব বিয়ে করে ফেলাতে ওর মোহ কেটেছে। আসলেই কি পুরোপুরি কেটেছে? সেটা শিহাবের মনে হয়না। কারণ খুব ঘন ঘন ওর বাসায় আসে ও। বিয়ে হয়েছে মাস দুয়েক হল। তার আগে একাই আসত। শিলার সাথে অবশ্য খুব ভাব ওর। আর অদ্ভুত মেয়ে এই শিলা। ওর প্রতি পিয়ার একটা দুর্বলতা ছিল জেনেও পিয়াকে বা ওকে কিছু বলেনা। আবার ওর এত ভক্ত বিশেষ করে মহিলা ভক্ত সেটা নিয়েও শিলার কোন হেলদোল চোখে পড়ে না ওর। ইনবক্সে কত মেয়ে কত কি লেখে শিলা কোনদিন দেখতেও চায়না সেসব। ওর বক্তব্য,
-আমি তো এটা জেনেই বিয়ে করেছি তোমাকে যে তোমার অনেক ভক্ত থাকবে।
এইজন্য এদিক থেকে নিশ্চিন্ত শিহাব। ওর লেখালেখিতে অন্তত ছেদ পড়বেনা। মোটামুটি একটা জায়গা করে নিয়েছে ও লেখালেখির জগতে। ওর কিছু লেখক বন্ধুদের অবস্থা বেশ সঙ্গীন। তাদের মিসেসরা কেউ চায়না যে ওরা লেখালেখি করুক। কারণ একটাই মহিলা ভক্তদের পাগলামী। শিলা এসব স্বাভাবিক ভাবেই দেখে।
একঘণ্টা হাঁটার পর বাসার দিকে হাঁটতে শুরু করলেন মিসেস রাহেলা। একমাস লাগাতার হাঁটাতে পেটের কাছটা টানটান লাগে। ওজন বেড়ে যাওয়াতে শারীরিক সমস্যা হচ্ছিল কিছুদিন যাবৎ। তাই চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়ম করে একঘণ্টা হাঁটেন প্রতিদিন। বাসার কাছে আসতে উনার গাড়ীটা গেট দিয়ে ঢুকতে দেখলেন। বুঝলেন পিয়া আর পলক ফিরে এল। শিহাবের বাসায় গিয়েছিল দুজন। উনি যদিও শিহাবের বাসায় পিয়ার যাওয়াটা পছন্দ করেন না তবু এতদিন কিছু বলেননি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বলতেই হবে। শিহাবের সংসারের সাথে সাথে নিজের সংসারেও যে একটা ঝামেলা ডেকে আনতে যাচ্ছে সেটা পিয়া কেন বুঝতে পারছে না কে জানে? সিঁড়িতে ওদের মুখোমুখি হলেন। ডুপ্লেক্স বাড়ীটা নিজেদের। মাল্টিপ্লেক্স করতে চেয়েছিল রায়হান। কিন্তু ওর অনুরোধে এটা ডুপ্লেক্স রেখে অন্য প্লটটাতে মাল্টিপ্লেক্স করেছে। একমাত্র মেয়ে বলে বিয়ের পর পিয়া এখানেই থাকে পলককে নিয়ে। পলকের দিকে তাকিয়ে হাসলেন,
-কেমন বেড়ালে?
-জী ভাল।
-কেমন লাগল ওদেরকে?
-জী ভাল। উনারা দুজনই খুব ভাল।
বিয়ের পর এই প্রথম শিহাবের বাসায় গিয়েছে পিয়া। শিহাবের বিয়ের পর পিয়া একাই যেত ওদের বাসায়। তখনো উনি ব্যাপারটা ভাল চোখে দেখেননি। শিহাবের প্রতি পিয়ার আকর্ষণের কথা উনিও জানতেন। শুধু উনিই না। পিয়ার আদিখ্যেতা এতটাই সীমা লঙ্ঘন করেছিল যে অনেকেই জেনে গিয়েছিল শিহাবের প্রতি ওর অনুরাগের কথা। শুধু যে কথা কেউ জানেনা এখনো সেটা হল শিহাবের বিয়ের পর পিয়া স্লিপিং পিল খেয়েছিল। উনি আর রায়হান মিলে সেটা সন্তর্পণে গোপন রেখেছিলেন। আর রায়হানের এক বন্ধুর নার্সিং হোমে নিয়ে পিয়ার চিকিৎসা করিয়েছিলেন। বাসায় ঢুকে নিজেই এককাপ রঙ চা বানিয়ে নিলেন। ওদের দুজনকেও বলেছিলেন। কিন্তু ওরা এখন খাবেনা বলতে নিজেই চা নিয়ে বসলেন। একটু জিরিয়ে তারপর গোসল করে নিবেন। পলক একটু বসে উঠে গেল একটা ফোন আসাতে। পিয়াকে নিজের ঘরে আসতে বলে উনিও ধীর পায়ে যেয়ে ঘরে ঢুকলেন। পিয়া ভয়ে ভয়ে মায়ের পিছু পিছু যেয়ে উনার ঘরে যেয়ে ঢুকল। মায়ের এই কণ্ঠস্বর ও খুব ভাল করে চেনে।
-আমি চাইনা তুমি আর শিহাবের ওখানে যাও।
-কেন?
একটু কি উদ্ধত শোনায় ওর কণ্ঠ!
-তুমি একসাথে দুটো সংসারে ঝামেলা বাধাতে চাচ্ছ।
শিলার মনোভাবকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে উনি কথাগুলো বললেন। উনার মনে হল পিয়ার চোখদুটো দপ করে জ্বলে উঠল। পিয়ার ধারণা উনি চাইলে শিহাবের সাথে ওর বিয়েটা হতে পারত। কিন্তু পিয়া এটা জানে না যে মিসেস রাহেলা শিহাবের সাথে গোপনে দেখা করেছিলেন কেন পিয়াকে বিয়ে করতে আপত্তি এটা জানার জন্য। আর তখনই জেনেছিলেন শিলার সাথে শিহাবের সম্পর্কের কথাটা। হয়তো জোর করতে পারতেন শিহাবকে। কিন্তু নিজে একটা মেয়ের মা হয়ে আরেকটা মেয়ের ভালবাসাকে ভেঙে দিতে উনার মন সায় দেয়নি।
-এরপর যেন তোমাকে আর শিহাবের বাসায় যেতে না দেখি।
পিয়া আবার ধীর পায়ে বের হয়ে গেল মায়ের ঘর থেকে। এই আদেশ না মানলে সমস্যা হবে ও জানে। ওর মা যেমন বন্ধুর মত আচরণ করে ওর সাথে সবসময় তেমনি কঠোর উনার যে কোন সিদ্ধান্তে। ও কোন ভুল করলে প্রথমে সংশোধন করার চেষ্টা করেন। তাতে কাজ না হলে খুব কঠোর হয়ে যান। একবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও মার খেয়েছিল মায়ের হাতে মায়ের কথা না শোনার জন্য।
শিহাব একুশে পদক পেল এ বছর। সম্মাননা দেওয়া হল শিহাব সহ আরো যারা পেয়েছিলেন তাদেরকে। পিয়া একেবারে নীরব থাকল। একটা ফোনও করলনা। দৈনিক পত্রিকায় ছবিসহ সবার নাম উঠেছে। অন্য সময় হলে পদক প্রদান অনুষ্ঠানে পিয়া যেত। কিন্তু সেদিনের মায়ের কথার পর আর সাহস হচ্ছে না ওর। শিলাকে ফোন করল,
-হ্যালো।
ওপারে শিলার কণ্ঠ।
-কেমন আছ?
-ভাল। তুমি আর আসনা কেন?
-একটু ব্যাস্ততা যাচ্ছে তো। তাই..
-হুম। ব্যস্ততা কমলে এসো কিন্তু।
-আসব।
-খবর দেখেছ?
-হুম ভাবী। ভাইয়াকে আমার শুভেচ্ছা জানিয়ে দিও।
-আমি দিব কেন? তুমি ফোন করে জানাও।
-নাহ! তুমিই জানিয়ে দিও আমার হয়ে।
পদক প্রদান অনুষ্ঠানেও পিয়াকে না দেখে একটু চিন্তিত হল শিহাব। কোন অসুখ বিসুখ হল না তো! ও নিজেও খুব ব্যস্ত ছিল বলে ফোন করতে পারেনি এ ক’টা দিন।
-পিয়ার কোন খবর জানো?
অনুষ্ঠান শেষে গাড়ীতে উঠে শিলাকে প্রশ্ন করল শিহাব।
-হুম। কেন?
-নাহ! অনেকদিন আসেনা বাসায়।
-আমি আসতে বলি তো। এড়িয়ে যায়। কিন্তু ফোনে কথা বলে নিয়মিত।
যাক! অসুস্থ না এটা ভেবে শিহাব অন্তত স্বস্তি পেল।
-কি পুরনো প্রেম মনে পড়ছে নাকি?
শিহাব একটু হাসল। শিলা ভাল করেই জানে যেটা ছিল ওর আর পিয়ার মধ্যে সেটা একতরফা পিয়ার পাগলামীই ছিল শুধু। তবুও রসিকতা করার লোভ সামলাতে পারলনা,
-হুম! তা তো একটু পড়ছেই।
শিলা ওর পদকটা নেড়েচেড়ে দেখছিল। আচমকা মুখ তুলে শিলা বলে উঠল,
-চলনা চাচীর ওখানে যাই!
ভাল প্রস্তাব। যাওয়া যায়। আজ দুজনেই ছুটি নিয়েছে। চাচীকে একটা ফোন করে দিল শিহাব।
-আমিই নিষেধ করেছি ওকে তোমাদের বাসায় যেতে।
বাসায় পৌঁছে শিহাব প্রথমেই পিয়া কেন আর ওর বাসায় যায়না এ প্রশ্ন করেছিল।
-কিন্তু কেন চাচী?
-তুমি বুঝছ না কেন ও একসাথে দু দুটো পরিবারে ঝামেলা ডেকে আনতে চাচ্ছে?
সত্যি এভাবে তো ভাবেনি শিহাব। শিলা খুব বুঝের মেয়ে। কিন্তু পলক তো সেরকম না হতেও পারে। মাত্র বিয়ে হয়েছে। কতটুকুই বা চেনা গেছে ওকে! চাচী গ্র্যান্ড নবাব থেকে বাসমতী চালের বিরিয়ানী আনিয়েছিলেন ওদের জন্য শিহাবের পদক পাওয়া উপলক্ষে। সাথে ঐ দোকানেরই বোরহানী। আর বাবুর্চিখানার চাউলের জর্দা। খেয়ে দুজন বেরিয়ে পড়ল। পলক আর পিয়া দুজনেই অফিসে বলে দেখা হলনা ওদের সাথে।
দুই বছর পর –
-পুরস্কারটা তো আসলে নানুর পাওয়া উচিৎ।
-মানে!
শিহাবের কথার অর্থ না বুঝতে পেরে বলে ফেলল শিলা।
-মানে আমি যেটা বলতে চাচ্ছি রত্নগর্ভা তো আসলে আমার নানু।
-কিন্তু মা তো..
-বুঝতে পারছি তুমি কি বলতে চাচ্ছ। অথচ আমাদের ভুলটা কিন্তু এখানেই।
আবার অবাক হয়ে শিহাবের মুখের দিকে তাকাল শিলা।
-মানে বুঝলে না? আমার মা খুব যুদ্ধ করে আমাদের মানুষ করেছেন একা একা। তো একা যুদ্ধ করার এই মনোবলটা কোথায় পেলেন উনি?
শিলা আবার নির্বাক হয়ে শিহাবের মুখের দিকে তাকায়।
-নানু পাশে ছিলেন বলে উনি এই যুদ্ধ করার সাহসটা পেয়েছেন। আর স্নাতক পাশের কথা বলছ? আমরা চার ভাইবোনের মধ্যে কেউ ডাক্তার আবার কেউ বা ইঞ্জিনীয়ার এটা তো ঠিক?
-হুম। তো..
-এই যে আমরা কেউ ডাক্তার কেউ ইঞ্জিনীয়ার হয়েছি এটা তো মা’ই আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। আমাদের কারো কাছে কখনো এটা জানতে চাননি যে আমরা কে কি হতে চাই। এই দ্যাখ আমি পেশায় একজন ডাক্তার। কিন্তু ক’জন আমাকে ডাক্তার এই পরিচয়ে চেনে? অথচ আমি যদি এরকম কঠিন একটা পেশায় না আসতাম তাহলে লেখালেখিতে আরো বেশী সময় দিতে পারতাম। সেইভাবে একই কথা আমার অন্য ভাই-বোনের বেলাতেও প্রযোজ্য। সবাই যার যার পেশায় অসুখী। যেহেতু পেশাগুলো আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
একটু থেমে আবার বলতে শুরু করল শিহাব,
-অথচ দ্যাখ নানুও কিন্তু মাকে একাই মানুষ করেছেন। কারণ মায়ের অনেক ছোটবেলায় নানার মৃত্যু হয়েছিল। আবার আমার বাবাও মারা গেছেন আমাদের
ছোটবেলায়। নানু মাকে পড়াশুনা করাতে পারেন নি। সেই সময়ে উনার একার পক্ষে এটা সম্ভব ছিলনা। কিন্তু বাবা মারা গেলে কিন্তু আবার এসে মায়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন। নানার সমস্ত সম্পত্তি উজাড় করে আমাদের মানুষ করেছেন।
স্বল্পভাষী শিহাবকে যেন আজ কথায় পেয়েছে। আবার শুরু করল,
-আবার এটা দ্যাখ মা কিন্তু তার সিদ্ধান্ত সবসময় আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি আমার চাচীকে দ্যাখ উনি পিয়ার ভাল রেজাল্টে যেমন খুশী হয়েছেন পাশাপাশি রেজাল্ট খারাপ করলে ওর পাশে থেকেছেন। কিন্তু আমাদেরকে সবসময় ভয়ে থাকতে হত। কারণ খারাপ রেজাল্ট মা একদম মেনে নিতে পারতেন না। মায়ের সব না পূরণ হওয়া শখ আমাদের দিয়ে পূরণ করতে চেয়েছেন।
-একটা কাজ করলে হয়না!
-কি?
একটু উৎসাহ নিয়ে শিলার দিকে তাকাল শিহাব।
-এই পদক তো তুমি চাচীকে উৎসর্গ করে দিতে পার।
-ভাল কথা বলেছ তো! আমি ভাবছিলাম মায়ের পরিবর্তে নানুকে দেওয়ার অনুরোধ করব। এটা বরং ভাল হবে।
চিঠিটা হাতে নিয়ে অবাক হলেন মিসেস রাহেলা। এতদিন যাবৎ রত্নগর্ভা পুরস্কার দেওয়ার অনুষ্ঠানে কখনো তো আমন্ত্রণ পাননি! এবার হঠাৎ চিঠি এলো কেন? পিয়াকে দেখালেন চিঠিটা।
-ডেকেছে যখন যাও। ভাল লাগবে। সারাদিন তো বাড়ীতে একা একা থেকে বিরক্ত হয়ে যাও।
-কথাটা খারাপ বলিস নি। যাই তাহলে কি বলিস?
পিয়া মাথা নেড়ে সায় দিল।
পুরস্কার বিতরণের দিনে নির্দিষ্ট সময়ে চলে এল শিহাব। মা যেহেতু বেঁচে নেই সেহেতু উনার হয়ে শিহাবই পুরস্কারটা নিবে। ওর ভাইবোনেরাও এসে বসেছে হলঘরটায়। নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠান শুরু হল। প্রথমে বিশেষ অতিথি তারপর প্রধান অতিথি আর একেবারে শেষে সভাপতির বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হল। পুরস্কার দেওয়া শুরু হতে যখন ওর মায়ের নাম ঘোষণা করলেন ঘোষক শিহাব ধীরে ধীরে মঞ্চে উঠে গেল। পুরস্কারটা নেওয়া হলে ওকে কিছু বলতে অনুরোধ করলেন ঘোষক। ও মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে সবাইকে সম্ভাষণ করে শুরু করল ওর বক্তব্য,
-উপস্থিত সুধীমণ্ডলী ‘রত্নগর্ভা’ পুরস্কার প্রদানকারী সংস্থার প্রতি পুরো সন্মান রেখে বলছি শুধুমাত্র ছেলে বা মেয়ের একটা ডিগ্রী একজন মায়ের ‘রত্নগর্ভা’ হওয়ার যোগ্যতা হতে পারেনা। আমার মনে হয় সেই মা প্রকৃত রত্নগর্ভা যিনি ছেলে বা মেয়ের পাশে সারাজীবন বন্ধুর মত থেকেছেন। আর ভাল একজন মানুষ হতে উদ্বুদ্ধ করেছেন শুধু একটা ভাল ডিগ্রীর পিছনে না ছুটতে বলে। আর নিজের না পাওয়ার বোঝা চাপিয়ে দেননি নিজের ছেলে বা মেয়ের উপর। পাশাপাশি পড়াশুনাও শিখিয়েছেন। আমি আমার মায়ের হয়ে এই পুরস্কার নিয়েছি। কিন্তু আমি এই পুরস্কার আরেকজনকে উৎসর্গ করতে চাই যাকে আমার প্রকৃত একজন ‘রত্নগর্ভা’ বলেই মনে হয়েছে। গোটা হলঘরটা জুড়ে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। আর এই গুঞ্জনের প্রতি কোন তোয়াক্কা না করে শিহাব ওর চাচীর পাশে এসে উনাকে আস্তে করে মঞ্চে নিয়ে যেয়ে পদকটা উনার হাতে তুলে দিল।

লেখক: চিকিৎসক

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.