সংবাদ শিরোনাম
ফিলিপাইনে শক্তিশালী ভূমিকম্প, নিহত ৫  » «   স্ত্রী ও ৩ সন্তানকে হত্যা করে ভিডিও করলো যুবক  » «   আরব আমিরাতকে হারিয়ে শুভসূচনা বাংলাদেশের  » «   সুদান-আলজেরিয়ায় আরব বিপ্লবের নতুন ঢেউ  » «   ‘হামলায় ন্যাশনাল তাওহিদ জামাত জড়িত  » «   লাখাইয়ে নিখোঁজের ২ মাস পর মিলল কলেজ ছাত্রের লাশ  » «   হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে অজ্ঞাত মৃতদেহ উদ্ধার  » «   বালাগঞ্জের কাজীপুর গ্রামে তরুণের আত্মহত্যা  » «   শ্রীমঙ্গলে স্কুলছাত্রী ধর্ষণ: এসআই ক্লোজড, ওসি শোকজ  » «   বুধবার আসছে জায়ানের মরদেহ  » «   শেয়ারবাজার পতনে জড়িতদের খুঁজে বের করা হবে: অর্থমন্ত্রী  » «   শ্রীলঙ্কার সব স্কুল দুই দিন বেশি বন্ধের ঘোষণা  » «   শ্রীলঙ্কায় সিরিজ হামলায় নিহত বেড়ে ১৩৮  » «   ব্যারিস্টার আমিনুলের মৃত্যুতে ফখরুলের শোক  » «   বিএনপি নেতা আমিনুল হক আর নেই  » «  

গল্পে গল্পে ডায়াবেটিস

ডা. মো.এজাজ বারী চৌধুরী::ডায়াবেটিস মানে রক্তে সুগার বেশি। কী সমস্যা হয় রক্তে সুগার বেড়ে গেলে? আর কেনইবা এই সুগার বাড়ে? কোথা থেকে আসে এই সুগার? সুস্থ মানুষের রক্তে এই অতিরিক্ত সুগার থাকে না কেন?

আমাদের শরীর কোটি কোটি কোষ দিয়ে তৈরি এবং স্বাভাবিক কাজকর্মের জন্য, প্রত্যেকটি কোষেরই খাবার প্রয়োজন হয়। আমরা মুখে যা-ই খাই না কেন, হজম হয়ে সেগুলো এই সুগার তৈরি করে, যা সকল কোষের জন্যই আদর্শ খাবার। কিন্তু কোষগুলোর দেয়াল চর্বি দিয়ে তৈরি, আর চিনি তো তেলে মেশানো যায় না! সুতরাং ব্যতিক্রমী কিছু কোষ ছাড়া, বেশিরভাগ কোষই রক্ত থেকে সরাসরি তাদের খাবার, এই সুগারকে গ্রহণ করতে পারে না। কোষগুলোর দেয়ালে একটি দরজা থাকে, যেটা আবার লক করা থাকে। ইনসুলিন হলো সেই লকের চাবি। ইনসুলিন এসে, দরজা খুলে দিলেই কেবল— কোষগুলোতে রক্ত থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সুগার প্রবেশ করে। ফলে কোষগুলোও খাবার পায়, আবার রক্তেও অতিরিক্ত সুগারের জটলা থাকে না!

রাস্তার জ্যামের কথা চিন্তা করুন। কখন জ্যাম লাগে—যখন গাড়িগুলো তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না এবং সব রাস্তাতেই আটকে থাকে… সেটাই তো জ্যাম! একই রকমভাবে, ডায়াবেটিস হলো রক্তে সুগারের জ্যাম, কেননা সুগারগুলো তাদের গন্তব্য, ‘কোষে’ পৌঁছাতে পারছে না!

রক্তে বেশি সুগার থাকা মানেই হলো, আমাদের শরীরের কোষগুলি তাদের খাবার ঠিকমতো নিতে পারছে না এবং তারা ক্ষুধার্ত আছে। সুতরাং শরীরে দুর্বলতা বোধ হয় এবং কোষগুলোর ক্ষুধার হাহাকারে মস্তিষ্ক ‘পেটের ক্ষুধা’ আরো বাড়িয়ে দেয়, ফলে রোগী বেশি খায়। কিন্তু সেই অতিরিক্ত খাবার থেকে তৈরি হওয়া সুগারগুলো কেবল রক্তে সুগারের জটলাই বাড়ায়—কোষের ক্ষুধা মেটায় না।

আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা করি। কখন আপনি একটি দরজার লক খুলতে পারবেন না। ১) যখন চাবি হারিয়ে গেছে। ২) চাবি আছে, কিন্তু সেটা আঁকাবাঁকা হয়ে গেছে বলে তালা খুলছে না। ৩) তালার চাবি ঢোকানোর মুখটি কোনও কিছু দিয়ে আটকে আছে—যেজন্য আপনি চাবিই ঢোকাতে পারছেন না।

ডায়াবেটিস রোগীদের একইসঙ্গে এই তিনটি সমস্যাই থাকে— ইনসুলিনের অভাব, ইনসুলিন রেজিস্ট্রান্স এবং ইনসুলিন রিসেপ্টর ব্লক। তাই ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় বিভিন্ন প্রকারের ওষুধ ও ইনসুলিন একসঙ্গে ব্যবহার করতে হয় রোগীর শরীরের ভেতরের অবস্থা অনুধাবন করে।

আচ্ছা, যদি মাসের পর মাস রক্তের সুগার বেশিই থেকে যায়—তাতে কি সমস্যা? পানি থেকে শরবত তো কিছুটা ঘন তাই না? তাহলে বেশি সুগার রক্তের ঘনত্বকেও কিছুটা বাড়িয়ে দেবে। আমাদের শরীরে এমন সূক্ষ্ম শিরা-উপশিরাও আছে, যেগুলোকে খালি চোখে দেখা পর্যন্ত যায় না! এইসব সূক্ষ্ম রক্তনালী দিয়ে দিনে গড়ে এক লক্ষ পনের হাজার বার রক্ত চলাচল করে—আর মাসে প্রায় সাড়ে চৌত্রিশ লক্ষ বার! আমাদের পানির লাইনে যদি একমাস ধরে টানা ময়লা পানি আসে—তাহলে কত শক্ত মোটা পাইপের ভেতরেও আস্তরণ পড়ে, ব্লক হয়!

তাহলে ভেবে দেখুন, আমাদের দেহের অতি সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলোর কী অবস্থা হতে পারে? সেগুলো ব্লক হওয়া শুরু হয় এবং যেই কোষগুলোকে তারা রক্তের মাধ্যমে পুষ্টি এবং অক্সিজেন সরবরাহ করে আসছিলো—সেগুলো আস্তে আস্তে মরে যেতে শুরু করে। এজন্যই মস্তিষ্ক, চোখ, কিডনি, নার্ভ, হার্ট ইত্যাদির ক্ষয় শুরু হয়!

এবার আবার একটু পেছনে ফিরে যাই। যাদের ডায়াবেটিসের মাত্রা অনেক বেশি অর্থাৎ যাদের কোষগুলো খুব বেশি ক্ষুধার্ত থাকে, তাদের শরীরের কোষ মরে গিয়ে কোনও যায়গায় পচন ধরায় না কেন? কারণ, কোষগুলো তখন নিজ দেহের চর্বি খেয়ে (পুড়িয়ে) বেঁচে থাকে। যেহেতু তাদের দেয়ালও চর্বি দিয়ে তৈরি, তাই চর্বি কোষে প্রবেশ করতে কোনও সমস্যাও হয় না! কিন্তু এক্ষেত্রে বিপদ হয় অন্য। শরীর ভেঙে পড়তে থাকে, ওজন কমতে থাকে, ত্বকের কমনীয়তাও নষ্ট হয়ে যায় এবং রক্তে বিষাক্ত কেমিক্যাল জমতে থাকে!

আপনাকে একটা হোমওয়ার্ক দিই। গ্যাসের চুলার উপর এক টুকরা গরু বা খাসির চর্বি পোড়ান তো! দেখবেন, সারা বাড়ি উৎকট দুর্গন্ধে ভরে গেছে। কারণ চর্বি পোড়ালে বিষাক্ত কিছু কেমিক্যাল তৈরি হয়। সুতরাং উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিস রোগী যাদের কোষগুলোকে, শরীরকে খেয়েই বেঁচে থাকতে হচ্ছে, তাদের রক্তে প্রতিনিয়ত বিষাক্ত কেমিক্যালও জমা হচ্ছে… যা কখনো কখনো মানুষটিকে মৃত্যুর মুখোমুখিও নিয়ে যেতে পারে!

আর রক্তের ওই অতিরিক্ত সুগার দীর্ঘসময় ধরে থাকলে, আমাদের সব ভাইটাল অর্গান যেমন- ব্রেন, কিডনি, চোখ, নার্ভ, হার্ট ইত্যাদি নষ্ট হয়ে যাবে, এই অবস্থা থেকে বাঁচানোর জন্য ব্রেন কি কিছুই করে না? হ্যাঁ, করে। সেটা হলো, প্রস্রাব দিয়ে যতোটা পারা যায়, রক্তের সুগার বের করে দেয়। কিন্তু সুগার আবার পানিকে খুব ভালোবাসে। তাই একটি সুগার বের হয়ে যাবার সময় কয়েকটি পানিকেও সঙ্গে করে নিয়ে যায়। ফলে শরীরে পানির সংকট দেখা দেয়। গলা শুকিয়ে যায়, রোগীর ঘন ঘন পিপাসা পায়! জটিল আকার ধারণ করলে, এই পানিশূন্যতা মৃত্যুও ডেকে আনতে পারে!

অন্য যেকোনও রোগের চেয়ে, ডায়াবেটিসের চিকিৎসা সম্পূর্ণ আলাদা। রোগীর বয়স, পেশা, ওজন, লিঙ্গ, জীবনধারণ পদ্ধতি, সামাজিক অবস্থান, খাদ্যাভ্যাস, অন্যান্য অসুখের উপস্থিতি ইত্যাদি বহু বিষয়ের ওপর ডায়াবেটিসের সঠিক চিকিৎসা নির্ভর করে। এজন্যই একই ওষুধ বা ইনসুলিনের একই ডোজ, বিভিন্ন রোগীর শরীরে বিভিন্ন মাত্রার ফলাফল প্রদর্শন করে। আবার একই চিকিৎসা একই রোগীর ক্ষেত্রে, বেশিদিন একই ফলাফল বজায় রাখতেও পারে না। সুতরাং নির্দিষ্ট সময় পরপর চিকিৎসা modify বা adjust করতে হয়!

এবার আসি আমাদের দেশে ডায়াবেটিসের প্রচলিত চিকিৎসা প্রসঙ্গে। একজন রোগী ২/৩ মাসে একবার ডায়াবেটিস সেন্টারগুলোতে যান এবং তাদের মাত্র ১ দিনের সকালের ১টি বা ২টি সুগারের মাত্রার উপর ভিত্তি করে, পরবর্তী ২/৩ মাসের চিকিৎসা দেয়া হয়। অনেক রোগীই এই রক্ত পরীক্ষা উপলক্ষে, তার আগের ২-৩ দিন খুব নিয়ম মেনে চলেন, বেশি হাঁটাহাটি করেন এবং খাবারেও নিয়ন্ত্রণ আনেন — যেন রিপোর্ট ভালো আসে। আবার উল্টোটাও ঘটে — অনেকে পরীক্ষা করার দিন, ওষুধ খেতে ভুলে যান বা আনতে ভুলে যান বলে আর খান না। ফলে, ওষুধ বিহীন সেই ত্রুটিপূর্ণ রিপোর্টের উপর ভিত্তি করেই ঠিক হয় তাদের পরবর্তী চিকিৎসা!

এখানে চিন্তা করার বিষয়গুলো হচ্ছে:
১) শুধু সকালে সুগার ভালো রেখে, দুপুরে এবং রাত্রে বেশি থাকলে — আপনার চিকিৎসা কতখানি সুফল বয়ে আনছে আপনার জন্য? উপরের আলোচনার ভিত্তিতে একটু চিন্তা করুন!

২) নিজেকে ফাঁকি বা ডাক্তারকে ফাঁকি দেবার পরিণাম কাকে ভোগ করতে হবে ?

৩) আপনার ডাক্তার কি আপনার সব দিক বিবেচনায় এনে আপনার চিকিৎসা দিচ্ছেন? যেমন: আপনার পেশা কি, আপনি কি জাতীয় খাবার খান, আপনি কিভাবে জীবন যাপন করেন, আপনার টেনশন কেমন, অন্য আর কী কী রোগে আপনি ভুগছেন — ইত্যাদি। এছাড়া, আপনার ২৪ ঘণ্টা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে— উনি কি সচেতন?

আমি গত ১৪ বছর যাবৎ শুধু ডায়াবেটিস নিয়েই কাজ করেছি এবং অসীম কৌতূহল নিয়ে বিভিন্ন রোগীর শরীরে ইনসুলিন/ওষুধের ফলাফল বিশ্লেষণ করেছি। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চমাত্রার ডায়াবেটিসে ভুগতে থাকা অনেক জটিল রোগীদেরকেও — স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবন উপহার দিতে পেরেছি। এছাড়া আমার রোগীদেরকে ডায়াবেটিসের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহও যত্নসহকারে শিখিয়েছি।

কিন্তু আমার কাছে এখনও প্রতিটি ডায়াবেটিস রোগীই একেকটি রহস্য উপন্যাস! আর সেই রহস্য ভেদ করে, তাদেরকে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারার আনন্দটা একেবারেই অন্যরকম। এই আনন্দই আমার বেঁচে থাকার অন্যরকম অনুপ্রেরণা!!!

“ডায়াবেটিস রাখুন নিয়ন্ত্রণে
সুস্থ থাকুন দেহ মনে!”

লেখক: MBBS (DMC), CCD (BIRDEM) PGP in Diabetes (USA). ডায়াবেটোলজিস্ট এবং হেড অব ডায়াবেটিস সেন্টার, মুন্নু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.