সংবাদ শিরোনাম
যুক্তরাষ্ট্রে মৃত মানব শরীর কম্পোস্ট করে তৈরি হবে জৈব সার  » «   বিমান বাহিনীর প্রধান হিসেবে নারীকে মনোনয়ন দিলেন ট্রাম্প  » «   ফল ঘোষণার আগেই পাঁচ বছরের পরিকল্পনা স্থির মোদির  » «   রাজধানীতে কোনও ছিনতাইকারী নেই : আছাদুজ্জামান মিয়া  » «   বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ ॥ ধর্ষক গ্রেফতার  » «   সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের ইফতার মাহফিল সম্পন্ন  » «   বদলে গেল কিলোগ্রাম মাপার প্রতীক  » «   মার্কিন সুপারস্ট্রার সেলেনার বিয়ে এই ‘বুড়ো’র সঙ্গে!  » «   বশেমুরবিপ্রবি’র ৯ শিক্ষার্থীকে আড়াই লাখ টাকা অনুদান  » «   নতুন টাকার নোট বিনিময় কার্যক্রম শুরু  » «   বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপজ্জনক ক্রিকেটার জস বাটলার  » «   কানাইঘাটে পাওনা টাকার জের ধরে ধারালো চাকুর আঘাতে গুরুতর আহত মাইক্রোচালকের মৃত্যু  » «   ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফেলে যাওয়া সেই নবজাতককে নিলেন পুলিশ দম্পতি  » «   সিলেট নগরীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভিযান-জরিমানা  » «   ঈদের আগে সিলেটে ফিটনেসবিহীন বাসের বিরুদ্ধে অভিযানে পুলিশ  » «  

তবু শেষ রক্ষা হলো

নূর কামরুন নাহার::আরও আগেই পাওয়ার কথা ছিল তাঁর। বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক রিজিয়া রহমান সাহিত্যে একুশে পদক পেলেন। কবিতা দিয়ে লেখালেখি শুরু করলেও তাঁর প্রথম প্রকাশিত গন্থ ছিল গল্প সঙ্কলন অগ্নিস্বাক্ষররা। ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত এই গন্থের প্রায় সবগুলো গল্পই ছিল তাঁর ছাত্র জীবনের লেখা, এই বইয়ের ‘লাল টিয়ার আকাশ’ গল্পটি অশ্লীলতার দায়ে রোকেয়া হল ম্যাগাজিনে ছাপাতে নারাজ ছিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু পরে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী সম্পাদনা বোর্ডকে বলে তা ছাপানোর ব্যবস্থা করেন। ১৯৭৮ সালে নিষিদ্ধ পল্লীর নারীদের নিয়ে লেখা তার উপন্যাস‘রক্তের অক্ষর’ এবং বাঙালী জাতির গঠন ও ভাষার বিবর্তনের ওপর লেখা উপন্যাস ‘বং থেকে বাংলা’ প্রকাশিত হলে তিনি সাহিত্যবোদ্ধাদের দৃষ্টি আর্কষণ করেন। তাঁর সৃষ্টির জগত ব্যাপক ও বহুমাত্রিক। ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে মানুষের জীবন ও জীবনবোধকে শৈল্পিকভাবে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে রিজিয়া রহমান সৃষ্টি করেছেন তাঁর নিজস্ব ভাষাশৈলী ও নিজস্ব ধারা।

রিজিয়া রহমানের লেখার একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে অন্ত্যজ মানুষ ও তাদের যাপিত জীবন। তাদের জীবনের আনন্দ, বেদনা, হি¯্রংতা, ক্লেশ, জীবন সংগ্রাম। ‘একাল চিরকাল’ উপন্যাসে অন্ত্যজ মানুষের জীবনের চিত্র আঁকতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন তাদের বিবর্তন। এই মানুষগুলো বার বার বদলেছে তাদের পেশা। শিকারি থেকে কৃষক, কৃষক থেকে খনির শ্রমিক এই বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাঁওতালদের সংশয়, কুসংস্কার, হিংসা, রক্তারক্তি, সংস্কৃতি, কঠিন সংগ্রামের ইতিহাসও উঠে এসেছে এ উপন্যাসে যা নাকি মূলত মানুষের বেঁচে থাকারই ইতিহাস।

রিজিয়া রহমান শেকড় সন্ধানী লেখক। ইতিহাসের প্রতি নিষ্ঠা, মমত্ববোধ, মানুষের জীবনাচারণের প্রতি গভীর পর্যবেক্ষণ তার লেখাকে দিয়েছে ভিন্নতর মাত্রা। ‘বং থেকে বাংলা’ উপন্যাসে খুঁড়ে এনেছেন বাঙালীর ইতিহাস। গভীর অভিজ্ঞা, শ্রম, অধ্যবসায়, ইতিহাসজ্ঞান এবং শৈল্পিক চিন্তার এক অপূর্ব সমন্বয় ‘বং থেকে বাংলা’ উপন্যাসটি। বাংলা কথাসাহিত্যের এক উজ্জ্বল শিল্পকর্ম। ইতিহাস শুধু এখানে নিরেট ইতিহাস হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি ইতিহাস পরিণত হয়েছে শিল্পে এবং শিল্পসৃষ্টিতে ইতিহাসের পাতায় মিশেছে কল্পনা আর স্বপ্নের বুনন। ইতিহাস ও শেকড় খুঁড়ে চলা এ উপন্যাসেও রিজিয়া রহমান তুলে এনেছেন হাজার বছরের অবহেলিত, অধিকার বঞ্চিত মানুষের জীবনাচারণ তাদের বেঁচে থাকা আর বাঙালী জাতি গঠনের অতীত ইতিহাস।

 

রিজিয়া রহমানের সৃষ্টির জগতে আমরা নানাভাবেই দেখি শোষিত মানুষ আর মুক্তিকামী মানুষ। বেলুচিস্তানের স্বাধীনচেতা মানুষ, তাদের দেশ প্রেম, স্বজাত্যবোধ, গৌরব, সাহসের কাহিনী নিয়ে ‘শিলায় শিলায় আগুন’ উপন্যাস। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিলুচিস্তানের বিদ্রোহ ও কালাতের যুদ্ধের পটভূমিতে রচিত হয়েছে এ উপন্যাস। এই উপন্যাসেও আমরা দেখি সামাজিক রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার অধিকারহীন আর শোষিত মানুষের হৃদয়ের আর্তনাদ। বেলুচিস্তানের কাহিনীকে কেন্দ্র উপন্যাসটি লিখলেও তিনি বিশ্বব্যাপী শোষিত মানুষ, তাদের মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার স্বপ্ন আর সাহসকে তুলে এনেছেন শিল্পীর অন্তর্দৃষ্টি আর শৈল্পিক ব্যঞ্জনায়।

অলিখিত উপ্যাখ্যান উপন্যাসেও দেখা যায় বঞ্চিত আর শোষিত মানুষের ছবি। নীলকরদের অত্যাচার আর শোষণ। দেখা যায় প্রতিবাদী মানুষ ও তাদের সংগ্রাম। এবং এই যে মানুষের শিরায় শিরায় প্রবাহিত প্রতিবাদ এটা আমরা তাঁর নানা উপন্যাসে দেখি। রক্তের অক্ষরের বারবণিতা ইয়াসমিনকেও আমরা দেখি প্রতিবাদী হিসেবে, যে বুকের রক্ত ঢেলে দেয় কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে না। বঞ্চিত আর অন্ত্যজ মানুষের আর্তি তার গল্প, উপন্যাসের প্রধান অনুসঙ্গ হলেও রিজিয়া রহমান সুন্দরের প্রত্যাশী আর আশাবাদী মানুষ। রিজিয়া রহমানের লেখার ভাষা এ মাটি থেকে উৎসারিত। চরিত্রগুলো এ মাটির, এই মাটি সংশ্লিষ্ট ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বির্বতনের সাক্ষী তারা। তারা কখনও শোষিত, রক্তাক্ত, কখনও প্রতিবাদী। তারা মানবিক ভুল-ত্রুটি, অন্ধকার, ক্রোধ, লোভ, মমতা, মায়া, প্রেম ভালবাসা নিয়ে উজ্জ্বল ও জীবন্ত। মাটি, মানুষ, দেশ, ঐতিহ্য ও ইতিহাসের গভীর নিরীক্ষায় ঋদ্ধ এই ভাষাভঙ্গিতে পাঠক সহজেই তাই নিজেকে আবিষ্কার করেন এবং পাঠ করেন নিজের মনোজগত আর বিবর্তনের ইতিহাস। রিজিয়া রহমানের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে শিলায় শিলায় আগুন, ধবল জোৎস্না, প্রেম আমার প্রেম, সবুজ পাহাড়, বাঘবন্দী, আবে-হাওয়া, সুপ্রভাত সোনালি দিন, অতলান্ত নীল, উৎসে ফেরা, আলবুর্জের বাজ, পবিত্র নারীরা, সীতা পাহাড়ে আগুন, নিঃশব্দ শব্দের খোঁজে, প্রাচীন নগরীতে যাত্রা, চন্দ্রাহত, অভিবাসী আমি, নদী নিরবধি। তাঁর সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো-বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৮) যশোর সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার (১৯৮৪) হুমায়ুন কাদির স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৪) আসফ-উদ-দৌলা রেজা স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৪) বাংলাদেশ লেখক সংঘ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৫) কমর মুশতারি সাহিত্য পদক (১৯৯০) অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৫) এক্সিম ব্যাংক- অন্যদিন হুমায়ূন আহমেদ সাহিত্য পুরস্কার (২০১৮)।

 

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.