সংবাদ শিরোনাম
সিলেট সিটির ৮৩৯ কোটি ২০ লাখ ৭৬ হাজার টাকার বাজেট ঘোষণা মেয়র আরিফের  » «   সোবহানীঘাট মা ও শিশু হাসপতালে ভুল চিকিৎসায় শিশুর মৃত্যু  » «   জগন্নাথপুরে পৃথক দু’টি লাশ উদ্ধার  » «   সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আসপিয়া আর নেই,বিভিন্নজনের শোক প্রকাশ  » «   ১১বছর পর জানাগেল অপহরণ নয়; আত্মগোপনে ছিলেন ওই নারী  » «   জামালগঞ্জে বীরমুক্তিযোদ্ধা আফতাব আর নেই, বিভিন্ন মহলের শোক প্রকাশ  » «   গোলাপগঞ্জে গণপিটুনিতে এক ডাকাত নিহত,ডাকাতদের গুলিতে স্থানীয় ৫জন আহত  » «   কাকলির বিরুদ্ধে ৬২লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত, দাবী তদন্ত কমিটির  » «   স্কুল-কলেজ খুলেছে আজ: শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানগুলো  » «   দেড় বছর পর আগামীকাল সিলেটেও খুলছে স্কুল-কলেজ ও মাদরাসা  » «   করোনা আপডেট:গত সর্বশেষ চব্বিশ ঘন্টায় ২জনের মৃত্যু: শনাক্ত ৫৩  » «   কোম্পানীগঞ্জে ভাগ্নে বউকে ধর্ষণের অভিযোগে মামা শ্বশুর গ্রেফতার  » «   গরীব ও অসহাদের মাঝে চাউল বিতরন করল অনুসন্ধান কল্যান সোসাইটি সিলেট  » «   সিলেটে আসছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী  » «   আমার স্ত্রী-সন্তান হারিয়ে যায়নি নিয়েছে শাহাবউদ্দিন বাবুর্চি:দাবী আহত শফিকুলের  » «  

সাজানো বাগান এবং…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাজ্জাদ কাদির::কপালে বড় লাল টিপ, চোখে গাঢ় কাজল, গলায় কাঠ, মাটি কিংবা পাথরের গয়না পরিহিত শান্ত সৌম্য চেহারার অসম্ভব মায়াময় একজন মানুষকে। যার দিকে তাকালে এক সার্বজনীন মায়ের রূপ চোখে পড়ে; প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে খুঁজে পাওয়া যায়। সেই তিনি আর কেউ নন; তিনি আমাদের সবার প্রিয় ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। যিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ভাস্কর এবং জীবনযুদ্ধে হার না মানা এক লড়াকু সৈনিক। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এই মহান মানুষটির জন্মদিন ছিল। ২০১৮ সালের ৬ মার্চ তাঁর মত্যুর পর এবারই প্রথমবারের মতো তাঁর জন্মদিনকে কেন্দ্র করে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার লালমাটিয়ার সমকালীন চিত্রশালা শিল্পাঙ্গনে শুরু হয়েছে পক্ষকালব্যাপী শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘সাজানো বাগান’। এটি চলবে আগামী ৭ মার্চ পর্যন্ত।এই প্রদর্শনীতে ভাস্কর প্রিয়ভাষিণীর চারটি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। এ ছাড়া তাঁর পুত্র শিল্পী কারু তিতাস ও কন্যা ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী এতে অংশ নিয়েছেন। প্রদর্শনীতে সর্বমোট ৪৬টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে।

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর জীবনটি ছিল এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি আর সাহসের আধার। তাঁকে পাঠ করলে যে কোন মানুষই জীবনকে অর্থবহ করে বাঁচার জন্য নতুন করে স্বপ্ন দেখতে পারেন। আর তাঁর শিল্পকর্ম যেন আমাদের এই মাটির কথা বলে। মূলত ঘর সাজানো এবং নিজেকে সাজানোর জন্য দামী জিনিসের পরিবর্তে সহজলভ্য জিনিস দিয়ে কিভাবে সাজানো যায় তার সন্ধান করা থেকেই তিনি শিল্পচর্চা শুরু করেন। নিম্ন আয়ের মানুষ কিভাবে স্বল্প খরচে সুন্দরভাবে ঘর সাজাতে পারে সে বিষয়গুলো তিনি সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন তাঁর শিল্পকর্মে। প্রিয়ভাষিণী যেভাবে ফেলে দেয়া এবং ফুরিয়ে যাওয়া কাঠের টুকরো, শিকড়, গাছের গুঁড়িকে তুলে এনে নতুন জীবন দিয়েছেন তা এক কথায় অসাধারণ। এখানে তাঁর নিজের জীবনের সঙ্গে খানিকটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কারণ আমাদের এই দেশটির ঊষালগ্নে প্রিয়ভাষিণী প্রায় ফুরিয়েই যেতে বসেছিলেন। কিন্তু সেখান থেকে তিনি আবারও উঠে দাঁড়িয়েছেন।

তাঁর প্রতিটি শিল্পকর্মে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। এই প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া তাঁর ‘সাজানো বাগান’ সিরিজের শিল্পকর্মগুলোতে আমাদের চিরচেনা এই মাটির গন্ধ বিলায়। ছোট ছোট দরজা-জানালাসহ ছোট্ট ঘর। আবার সেই ছোট্ট ঘরের আশপাশে ছোট ছোট পাছপালা উঁকি দিচ্ছে। বর্তমানে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামের বাঁশ, কাঠের বেড়ার ঘর কিংবা ইট পাথরের এই শহরের স্বল্প আয়ের মানুষগুলো যে ঘরে বাস করেন যেন তার প্রতিকৃতি দেখতে পাওয়া যায় এগুলোতে। এই শিল্পকর্মগুলোর মাধ্যমে প্রিয়ভাষিণী প্রান্তিক মানুষের কথা বলতে চেয়েছেন। তাঁর সকল শিল্পকর্মের মতো এগুলোও অত্যন্ত সহজবোধ্য এবং প্রশান্তিদায়ক।

 

 

পিয়ভাষিণীর সন্তানেরা মায়ের সংগ্রাম এবং শিল্পী সত্তাকে দেখতে দেখতেই বড় হয়েছেন। তাঁর অস্তিত্বকে আপাদমস্তক বরণ এবং ধারণ করেছেন এ কথা বলা যায়। তাঁর কন্যা ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনীর মিশ্র মাধ্যমে করা ‘স্মৃতির মায়া’, ‘পল্লী মায়ের কোল’, ‘শান্তির কুটির’, ‘মহাকাল বালিকা বিদ্যালয়’, ‘স্মরণের জানালা’ সিরিজ কিংবা ‘বিউটি বোর্ডিং’ সিরিজের শিল্পকর্মগুলোতে যেন মায়েরই অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। মা মেয়েতে এতটা মেলবন্ধন কীভাবে সম্ভব সেটিও বিস্ময় জাগায়। ফুলেশ্বরীর কাজগুলো দেখে মনে হয়েছে তিনি যদি নিয়মিত শিল্প চর্চা করে যান তা হলে আমরা এই অঙ্গনের আর একজন বিদগ্ধজনকে যে পাব এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

প্রিয়ভাষিণীর প্রথম সন্তান এবং যোগ্য উত্তরসূরি শিল্পী কারু তিতাস। মায়ের সঙ্গেই তিনি হাত ধরাধরি করে শিল্প এবং জীবনের কঠিন বাস্তবতার মাঝে বেড়ে উঠেছেন। এ জন্যই হয়তবা তাঁর প্রতিটি চিত্রকর্মে প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া জলরঙ ও এ্যাক্রিলিকে করা ‘অনন্ত জীবন’ সিরিজের চিত্রকর্মগুলো আমাদের ভাবনাকে দারুণভাবে নাড়া দেয়। প্রতিটি চিত্রকর্মে তিনি প্রান্তিক মানুষের জীবনের জয়গান গেয়েছেন।

তাঁর এই কাজগুলোতে জেলে, মজুর তথা গায়েগতরে খেটে খাওয়া মানুষগুলোর প্রত্যাহিক যাপিত জীবন আমরা দেখতে পাই। জীবনগুলো নিতান্তই সাদাকালো কিন্তু অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ। কোন দুঃখ-কষ্ট এই জীবনগুলোকে স্পর্শ করতে পারে না। যেমন পেন স্কেচে করা একটি চিত্রকর্মে মুহূর্তেই চোখ আটকে যায়। দূর গ্রামের রূপ যৌবনহীন কোন এক রেলস্টেশনে দাঁড়ানো লোকাল ট্রেনে একদল শ্রমজীবী মানুষের ট্রেনে ওঠার প্রচ- প্রতিযোগিতা যেন আমাদের জীবনের প্রত্যাহিক রেসের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

তাঁর শিলপকর্ম নিয়ে আলাপ প্রসঙ্গে শিল্পী কারু তিতাস বলছিলেন, ‘নগর জীবনে আমাদের শরীর ঠিক রাখার জন্য আমরা সকাল-বিকেল জগিং করি আর এই প্রান্তিক মানুষগুলো বাংলাদেশের শরীর ঠিক রাখার জন্য তাঁদের জীবনের প্রতিটি সময় জগিং করে চলেছে।’ তিনি তঁঁর চিত্রকর্ম দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন যে, এই প্রান্তিক মানুষগুলোই বাংলাদেশ। আর এই মানুষগুলো ভাল থাকলেই বাংলাদেশ ভাল থাকবে।

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী আজ আমাদের মাঝে শারীরিকভাবে নেই। কিন্তু তিনি তাঁর কাজ এবং এক অনন্য জীবন বোধের কারণে আমাদের অস্তিত্বে মিশে আছেন। থাকবেন অনন্তকাল ঠিক যতদিন বাংলাদেশ থাকবে।

এ ছাড়াও থাকবেন সন্তানদের মাধ্যমে তাঁর গড়া সাজনো বাগানে। কাছাকাছি সময়ে তঁাঁর জন্ম এবং মৃত্যুদিনের প্রাক্কালে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি ও তাঁর শিল্পী সন্তানদের জন্য শুভ কামনা।


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.