সংবাদ শিরোনাম
ভক্তদের সারপ্রাইজ দিলেন মুশফিক  » «   করোনাকালে হাসপাতালেই হলো ডাক্তার আর নার্সের বিয়ে  » «   স্টেশনেই মরে পড়ে আছে মা, জাগাতে চেষ্টা করছে শিশু!  » «   করোনা মোকাবিলায় সফল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে নিউজিল্যান্ড  » «   করোনা: দেশে একদিনে মৃত্যু ২২, নতুন শনাক্ত ১৫৪১  » «   স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন চলাচল করতে পারবে  » «   ঈদের ছুটি নিলেন না আনোয়ারা খান হাসপাতালের ডাক্তার ও নার্সরা  » «   বাড়ছে না সাধারণ ছুটি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে ৩১ মে থেকে অফিস  » «   খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন মান্না  » «   ‘বিএনপি রাজনৈতিক আইসোলেশনে রয়েছে’  » «   রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড:করোনাভাইরাস আক্রান্ত পাঁচ রোগীর মৃত্যু  » «   সিলেটে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা:এক দিনে ৪২ জন শনাক্ত  » «   জাফলংয়ে বাড়ছে পানি, বাঁধ রক্ষার আকুতি  » «   জগন্নাথপুরে নারায়নগঞ্জ ফেরত ৭ জন কোয়ারেন্টাইনে  » «   জগন্নাথপুরে মাছ শিকার উৎসব  » «  

হাকালুকি হাওরে বোরো ধান কাটা শুরু, শ্রমিক সংকটের শঙ্কায় কৃষকরা

নাজমুল ইসলাম,কুলাউড়া::এশিয়ার বৃহত্তম হাকালুকি হাওরে আধাপাকা বোরো ধানগুলো সোনালি রং ধারণ করতে শুরু করেছে। নির্ধারিত সময়ের সপ্তাহ খানেক আগ থেকে কৃষকরা ধান কাটা শুরু করেছেন। কিন্তুু করোনা ভাইরাসের আতঙ্কের কারণে এবার শ্রমিক সংকট থাকায় কৃষকরা জমির পাকা ধান কাটতে পড়েছেন মহা বিপাকে। প্রাকৃতিক দূর্যোগের কালবৈশাখি ঝড়, শিলাবৃষ্টি আর বজ্রপাত আতঙ্কের মধ্যে করোনায় আতঙ্ক বিরাজ করছে কৃষকের মনে। এই অবস্থায় কষ্টের ফসল মাঠে ফেলে রাখতে চায়না কৃষকরা । হাওরের পাকা ধান গোলায় তোলতে মরিয়া হয়েছেন হাওর পারের কৃষাণ-কৃষাণীরা। করোনার ভয় তাদের ধমিয়ে রাখতে পারেনি। তাদের মনে একটাই প্রশ্ন, সময়মতো কি ধান কেটে গোলায় তুলতে পারবেন।  অনেকটা মনের আনন্দে আবার অনেকটা কষ্ট নিয়ে বোরো ধান কাটছেন হাকালুকি তীরের কৃষকরা।

এদিকে কৃষকদের উৎসাহ ও দুস্থ শ্রমিকদের সাহয্যের জন্য সরেজমিন হাকালুকি হাওর পরিদর্শন করেছেন মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরিন। তিনি গত সোমবার হাওর পারের বিভিন্ন কৃষকদের ধানি জমিন পরিদর্শন করে তাদেরকে বোরো ধান কাটতে উৎসাহিত করেন এবং দুঃস্থ শ্রমিকদের মাঝে বিভিন্ন ত্রান সামগ্রী বিতরণ করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন মৌলভীবাজার পুলিশ সুপার ফারুক আহমেদ পিপিএম(বার) সহ প্রশাসনে বিভিন্ন কর্মকর্তারা।

এই মৌসুমে কুলাউড়ার বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকরা উৎসব মুখর পরিবেশে বোরো ধান কাটতে আসলেও এবার তা ভিন্ন চিত্র।  করোনা ভাইরাসের ভয়ে দূরদূরান্ত থেকে কোন শ্রমিক ধান কাটতে হাওরে আসছে না। ফলে কৃষকদের এখন ধান কাটার শ্রমিক সংকটে মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

এছাড়াও হাওর তীরের কৃষকের গোলায় বোরো ধান ওঠা নির্ভর করে প্রকৃতির ওপর। কেননা এখানে ভারী বৃষ্টিপাত হলে পাহাড়ি ঢল নেমেই প্রথমে বোরো ধান তলিয়ে দেয়। গত দুই-তিন দিন থেকে মূষলধারে বৃষ্টিপাত হওয়ার ফলে কৃষকের মধ্যে করোনা ভাইরাস, শ্রমিক ও প্রাকৃতিক দূর্যোগ নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা রয়েছেন। এই সংকটময় মুহুর্তে কুলাউড়া, বড়লেখা ও  জুড়ি উপজেলায় বৃস্তির্ণ হাওরে শত শত একর জমির বোরো ধান কাটতে মাঠে নেমেছেন গ্রামের কৃষক ছাড়াও স্কুল কলেজ পড়–য়া অনেক শিক্ষার্থীরা।

(২২ এপ্রিল) বুধবার সকালে সরেজমিন হাকালুকি হাওর এলাকা ঘুরে দেখা যায় ধান কাটার এসব চিত্র। পুরুষের সঙ্গে সমানতালে মাঠে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন নারী ও শিশু। পুরুষরা ধান কাটছেন এবং পাশের খালি জায়গায় রাখছেন। একদল পুরুষ ধান মেশিনে মাড়াই করছেন। আর পুরুষের পাশাপাশি নারীরা এই ধানগুলো স্থানীয় ভাষায় (খলায়) নিয়ে শুকানোর কাজ করছেন। তাদের সাথে সঙ্গ দিচ্ছেন পরিবারের শিশু সদস্য ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। পরে এই ধানগুলো ঠেলা ও ট্রলি গাড়ী দিয়ে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন কৃষকরা।

কৃষকরা জানান, বোরো মৌসুমে ধান কাটার সময় হাওরের চাষী পরিবারের নারী পুরুষ সাধারণত বাড়িতে থাকেন না। সবাই হাওরে গিয়ে একত্রে কাজ করেন। কিছু কৃষক বোরো ধানে ভাল ফলন পাওয়ায় তারা বেজায় খুশি। আবার কিছু কৃষক ফলন ভালো না হওয়ায় হতাশায় পড়েছেন।

কুলাউড়ার ভাটেরা হিন্নাত ও বেড়কুড়ি এলাকার কৃষক আজমল আলী, মকদ্দস আলী, আখদ্দস মিয়া,সাইফুল,ভুকশিমইল ইউনিয়নের হাওর পারের কৃষক আনোয়ার হোসেন, আলাউদ্দিন,নজমুল হক,আব্দুল আজিজ,জুড়ী উপজেলার জায়ফর নগর ইউনিয়নের বেলাগাঁও ও শাহপুর এলাকার আব্দুর রহমান,ফজলু মিয়া,লালা মিয়া,কাজল জানান, প্রচন্ড খরার কারণে এবার বোরো ধানের ফলন তেমন ভালো হয়নি। ধান কাটার আগে কোন বৃষ্টিপাতও হয়নি। প্রতিবছর বোরো ধান কাটার মৌসুমে বিভিন্ন স্থান থেকে কৃষি শ্রমিকরা হাকালুকি হাওরে আসতেন। মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে এবছর এখনো কোন শ্রমিক না আসায় আমরা কৃষকরা জমির পাকা ধান নিয়ে বেকায়দায় পড়েছি। বাধ্য হয়ে কৃষকরা নিজেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ধান কাটা শুরু করেছি। আবার গত কয়েকদিন থেকে মূষলধারে বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ায় হাওরে পানি বাড়তে শুরু করেছে ফলে বাকি ধানগুলো ঘরে তুলা নিয়ে দুষচিন্তায় আছেন কৃষকরা।

হাওরপাড়ের কৃষক সমছু মিয়া, ফুয়াদ মিয়া বলেন, আমরা এবার প্রায় ৮ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছি। এবার খরার কারণে ধানের অনেক ক্ষতি হয়েছে। ৭-৮ হাটু ধান পেতে পারি। গত বছর এই ৮ একর জায়গায় আমি ২০ হাটু ধান পেয়েছিলাম। তবে দুষচিন্তার বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে এখন কালবৈশাখী জড় ও শীলা বৃষ্টি।

সপ্তাহ খানেক সময়ের ভিতরে জমির ধান না কাটতে না পারলে অনেক ধান নষ্ট হয়ে যাবে। অন্যান্য জাতের ধান আগামী ১০ দিনের মধ্যে কেটে শেষ করতে হবে। তা না হলে হাওরে পানি চলে আসতে পারে। এখন কী করবো আমরা বুঝে উঠতে পারছি না। দেশের মোট বোরো ফসলের প্রায় ১৯ শতাংশ আসে এসব হাওর থেকে। গত দুই বছর অকাল বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে কৃষকরা বোরো ধান ঘরে উঠাতে পারেননি। এতে এক ফসলি জমির ওপর নির্ভরশীল কয়েক হাজার পরিবার অনেকটা নিঃস্ব হয়ে গেছে।

অনেক কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হাওরের ভিতরে কয়েকটি ছড়া-খালে পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। শুষ্ক মৌসমে পানির ব্যবস্থা থাকলে আমাদের চাষাবাদে অনেক সুবিধা হতো। তাছাড়া সরকারি কোন সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছিনা। এদিকে ফানাই নদী খননের কারণে উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার, কাদিপুর, বরমচাল, ভাটেরা ইউনিয়ন ও ভূকশিমইল ইউনিয়নের আংশিক এলাকার অনেক কৃষক এবার বোরো ধান আবাদ করতে পারেনি।

বিপর্যস্ত কৃষকরা বলেন, আমাদের কষ্ট ও শ্রমিক সংকট দেখে এলাকার স্কুল কলেজ পড়–য়া ছাত্ররা স্বেচ্ছায় আমাদের  ধান কেটে দিচ্ছে। আমাদের গ্রামের স্কুল, কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা ধান কেটে কৃষকদের সহায়তা করায় আমরা জমির পাকা ধান ঘরে তুলতে পারছি এটি একটি ভালো উদ্যোগ।

হাকালুকি হাওর তীরের ছকাপন স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্র জয়দেব ও ভূকশিমইল স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্র সিপার জানায়, করোনা পরিস্থিতিতে কলেজ বন্ধ থাকায় আমরা এখন অবসর সময় কাটাচ্ছি। তাই স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিজের ও প্রতিবেশীদের জমির ধান কেটে দিচ্ছি। তারা বলেন, আমরা ২০-২৫ জনের একটি দল কৃষকদের দূর্ভোগের কথা ভেবে ধান কাটার কাজ করছি। পারিশ্রমিক হিসেবে কৃষকরা আমাদের যা দিচ্ছেন তাই নিচ্ছি।

হাকালুকি হাওর তীরের ভূকশিমইল স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেয়া তারেক আহমদ (১৭) ও তার সহোদর একই প্রতিষ্ঠানের ৭ম শ্রেণীর ছাত্র তাহের আহমদকে ধান কাটতে দেখা গেছে। ধান কাটার সময় তারা দুই ভাই জানান, করোনা পরিস্থিতিতে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় হাওরতীরের হোসেন আলী নামের এক কৃষকের এক কেয়ার ধান ১৬০০ টাকার বিনিময়ে আমরা কেটে দিচ্ছেন।

কুলাউড়া উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, হাকালুকি হাওর তীরের কুলাউড়ায় গত বছর ছয় হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়। এবার কুলাউড়ায় প্রায় সাড়ে ছয় হাজার কৃষক বোরো ধান আবাদ করেছেন। হাকালুকি হাওর তীরের ভূকশিমইল, ভাটেরা, বরমচাল, কাদিপুর, জয়চন্ডী ও ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের অংশে কৃষকরা ব্রি ধান-২৮, ব্রি ধান- ২৯, ব্রি ধান-১৪, ব্রি ধান-৮৪ জাতের বোরো ধান আবাদ করেছে। বিশেষ করে হাকালুকি হাওরে বিভিন্ন ছড়া বা খাল খনন করলে কৃষকদের জন্য অনেক সুবিধা হতো। খননের বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন দেখভাল করে।

কুলাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জগলুল হায়দার বলেন, কুলাউড়ায় এবার ৬ হাজার ৯ শ’ ২০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে শুক্রবার পর্যন্ত প্রায় ৬ শ’ হেক্টর জমির বোরো ধান কাটা শেষ হয়েছে। বিশেষ করে প্রাকৃতিক দূর্যোগের কথা চিন্তা করে সরকারি নির্দেশে মাঠ পর্যায়ের কৃষি উপসহকারী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে কৃষকদের জানানো হয়েছে যে, ৮০ শতাংশ ধান পাকা হলে ধান কাটা শুরু করতে হবে। তাহলে কৃষকরা ক্ষতির সম্মুখীন হবে না। স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের ধান কাটার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে ধান কাটার জন্য এক এলাকার শ্রমিক অন্য এলাকায় যেতে চাইলে জেলায় চলমান লকডাউনে কোন সমস্যা হবেনা। বরং প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদেরকে সার্বিক সহায়তা করা হবে।

এব্যাপারে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরিন বলেন,হাকালুকি হাওরে বোরো ধান কাটতে তেমন শ্রমিক সংকট নেই। তারপরও ধান কাটতে যদি কৃষকদের শ্রমিক প্রয়োজন পড়ে তাহলে তাঁরা অন্য জায়গা থেকে শ্রমিক আনতে পারবে। এছাড়া শ্রমিকদের মাঝে ত্রান বিতরণের জন্য জেলা প্রশাসন নিরলশ কাজ করে যাচ্ছে। প্রয়োজন হলে আরও ত্রান বাড়ানো হবে।

 

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.