সংবাদ শিরোনাম
জগন্নাথপুরে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা জরিমানা আদায়  » «   গোয়াইনঘাটে এসএসসিতে পাশের হার ৭৯.২৭ জিপিএ ৪৫ জন  » «   দিরাইয়ে ৩শ মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ প্রণোদনা প্রদান  » «   আজ থেকে সিলেটে বাসসহ গণপরিবহন চলাচল শুরু  » «   সিলেটে এবার ঘরে উল্লাস কৃতী শিক্ষার্থীদের:পাসের হার ৭৮.৭৯ জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪২৬৩ জন  » «   স্বাস্থ্যবিধি মেনে সিলেটে শুরু হয়েছে ট্রেন চলাচল  » «   গোয়াইনঘাটে আরও এক করোনা রোগী শনাক্ত:মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৪  » «   বাঁচা মরা তো আল্লাহর হাতে:আমার স্ত্রীর অবস্থা খুবই খারাপ-মানবতার ফেরিওয়ালা মাকসুদুল  » «   এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল আজ  » «   কোমা থেকে জাগলেন করোনায় আক্রান্ত ব্রিটিশ পাইলট  » «   করোনা প্রতিরোধে জনপ্রতিনিধিদের আরও সম্পৃক্তির আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর  » «   লিবিয়ায় নিহতদের মরদেহ বাংলাদেশে আনা যাবে না  » «   জগন্নাথপুরে জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল  » «   সুনামগঞ্জে পূর্ব শত্রুতার জেরে প্রতিপক্ষের হামলা আহত ২-থানায় অভিযোগ  » «   জগন্নাথপুরে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন এক নারী চিকিৎসক  » «  

কুরআন-হাদিসের আলোকে মহামারির কারণ ও করণীয়

মাওলানা আনোয়ার হোসাইন::মহান আল্লাহ তায়ালা মানবজাতি সৃষ্টি করে আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে ভূষিত করেছেন।

আর এ সৃষ্টির সেরা জীব যদি তার আসল মালিককে ভুলে যায় এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ অমান্য করে, তাহলে তার মালিক তার প্রতি শুধু অসন্তুষ্টই হন না, বরং তাকে শাস্তি দিতে বাধ্য হন।

তবে আল্লাহ তায়ালা যেহেতু অতিশয় মেহেরবান ও দয়ালু, তাই তিনি তাত্ক্ষণিক শাস্তি প্রয়োগ করেন না।

তিনি অবকাশ দেন, বারবার সুযোগ দেন। তা ছাড়া আমাদের প্রিয় নবী (সা.) আল্লাহ তায়ালার কাছে এ দোয়া করেছিলেন যে তাঁর উম্মতকে যেন আগেকার উম্মতের মতো শাস্তি তথা মানবাকৃতিকে বানর, শূকর ইত্যাদির আকৃতিতে রূপান্তর, পাথরের বৃষ্টি, ভূমি উল্টিয়ে দেয়ার মতো কঠিন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিনষ্ট করা না হয়।

মহামারির কারণ:

মানুষ পাপ করতে করতে যখন পাপের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখনই আল্লাহর শাস্তি নাজিল হয়। পাপিষ্ঠ ফেরাউনকে আল্লাহ তায়ালা তখনই ধরেছেন, যখন সে নিজেকে আল্লাহ বলে দাবি করেছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন : ‘হে মুসা! তুমি ফেরাউনের কাছে যাও, সে অত্যন্ত উদ্ধত হয়ে গেছে।’ (সূরা: ত্বাহা, আয়াত ২৪)।

নমরুদকে আল্লাহ তায়ালা তখনই শাস্তি দিয়েছেন, যখন সে নিজেকে প্রভু বলে দাবি করেছে। অনুরূপভাবে আদ, সামুদ প্রভৃতি জাতিকে তাদের সীমাহীন পাপাচারের কারণে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।

বনি ইসরাইলরা আল্লাহর কিতাব তাওরাতকে অস্বীকার, উত্তম জিনিস তথা মান্না ও সালওয়ার পরিবর্তে খারাপ জিনিস তথা ভূমির উৎপন্ন জিনিস চাওয়া, আমালেকা সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আল্লাহর অগণিত নিয়ামত ভোগ করেও অকৃতজ্ঞ হওয়ার কারণে চির লাঞ্ছনা ও আল্লাহর ক্রোধে পতিত হয়েছে।

আগের নবীদের এসব কাহিনী পবিত্র কোরআনে আলোচনা করে আল্লাহ তায়ালা এটিই বোঝাতে চেয়েছেন যে, যদি উম্মতে মুহাম্মদী (সা.)ও তাদের মতো পাপাচারে লিপ্ত হয়, তবে তাদের পরিণতিও অনুরূপ হবে এবং একই ভাগ্য বরণ করতে হবে।

মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা বলেন,

ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُم بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ

‘স্থলে ও জলে মানুষের কৃতকর্মের দরুন বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সূরা: রূম, পারা: ৩০, আয়াত: ৪১)।

قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِن قَبْلُ كَانَ أَكْثَرُهُم مُّشْرِكِينَ

‘বলুন, তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর এবং দেখ তোমাদের পুর্ববর্তীদের পরিণাম কি হয়েছে। তাদের অধিকাংশই ছিল মুশরিক।’ (সূরা: রূম, পারা: ৩০, আয়াত: ৪২)।

হাদিস শরিফে প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :

…لَمْ تَظْهَرْ الْفَاحِشَةُ فِي قَوْمٍ قَطُّ حَتَّى يُعْلِنُوا بِهَا إِلَّا فَشَا فِيهِمْ الطَّاعُونُ وَالْأَوْجَاعُ الَّتِي لَمْ تَكُنْ مَضَتْ فِي أَسْلَافِهِمْ

…যখন কোনো কওমের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা তা প্রকাশ্যেও করতে শুরু করে তবে তাদের মাঝে দুর্ভিক্ষ ও মহামারি ব্যাপক আকার ধারণ করে, যা তাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে ছিল না।’ (ইবনু মাজাহ, আসসুনান : ৪০১৯)।

মহামারিতে মুমিনের করণীয়:


 প্রযুক্তি অনেক দূর এগিয়েছে। প্রযুক্তির হাত ধরে বিশ্ব এগিয়েছে অনেক দূর। কিন্তু তার মানে এই নয় যে মানুষ অসীম শক্তির অধিকারী হয়ে গেছে। মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি। আল্লাহ তাদের যতটুকু জানান, তারা ততটুকুই জানে। যতটুকু শক্তি দান করেন, মানুষ ততটুকুই প্রয়োগ করতে পারে। এর বাইরে মানুষের কোনো ক্ষমতা নেই।

বর্তমানে ‘করোনা’ নামের নতুন একটি ভাইরাস এসে আমাদের সে কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এই ভাইরাসে এ পর্যন্ত বহু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এই ভাইরাস সংক্রান্ত খবরগুলোতে চীনের নাম বেশি শোনা গেলেও বিশ্বের অনেক দেশেই ধীরে ধীরে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ছে। বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, এই রোগের কোনো প্রতিষেধক এখনো তৈরি করা সম্ভব হয়নি।

কিছুদিন পর পর নতুন নতুন রোগব্যাধি ও ভাইরাস এসে এ বিষয়টি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা যত উন্নতিই করি, মহান আল্লাহর রহমত ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। এ কারণেই আমাদের উচিত, আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া জ্ঞাপন করা এবং সব পাপ থেকে মহান আল্লাহর কাছে তওবা করা। কারণ আমাদের পাপের কারণেই আমাদের ওপর বিভিন্ন আজাব নেমে আসে।

রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে তখন সেখানে মহামারি আকারে প্লেগরোগের প্রাদুর্ভাব হয়। তা ছাড়া এমন সব ব্যাধির উদ্ভব হয়, যা পূর্বেকার লোকদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪০১৯)

মনে করা হচ্ছে, সার্স বা ইবোলার মতোই প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসও। তবে এটি নাকি সার্স বা ইবোলার চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক। করোনাভাইরাস মানুষের ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায় এবং শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমেই এটি শরীরে ছড়ায়। (সার্স)

এই ভাইরাস এর আগে কখনো মানুষের মধ্যে দেখা যায়নি। তবে ২০০২ সালে চীনে সার্স (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) নামের একটি ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছিল, যাতে সংক্রমিত হয়েছিল ৮ হাজার ৯৮ জন। মারা গিয়েছিল ৭৭৪ জন। সেটিও ছিল এক ধরনের করোনাভাইরাস। করোনাভাইরাসের লক্ষণগুলো হলো কাশি, জ্বর, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, নিউমোনিয়া।

এই মুহূর্তে আমাদের সবার উচিত, মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকা, সর্বদা পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন থাকা। কারণ কিয়ামতের নিদর্শনগুলোর একটি হলো  মহামারি।

রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের আগের ছয়টি নিদর্শন গণনা করে রাখো। আমার মৃত্যু, অতঃপর বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়, অতঃপর তোমাদের মধ্যে ঘটবে মহামারি, বকরির পালের মহামারির মতো, সম্পদের প্রাচুর্য, এমনকি এক ব্যক্তিকে এক শ দিনার দেওয়ার পরও সে অসন্তুষ্ট থাকবে। অতঃপর এমন এক ফিতনা আসবে, যা আরবের প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করবে। অতঃপর যুদ্ধবিরতির চুক্তি, যা তোমাদের ও বনি আসফার বা রোমকদের মধ্যে সম্পাদিত হবে। অতঃপর তারা বিশ্বাসঘাতকতা করবে এবং ৮০টি পতাকা উড়িয়ে তোমাদের বিপক্ষে আসবে; প্রতিটি পতাকার নিচে থাকবে ১২ হাজার সৈন্য। (বুখারি, হাদিস : ৩১৭৬)

হাদিসের ভাষ্যের সঙ্গে আমাদের বর্তমান পরিস্থিতি অনেকাংশেই মিলে যায়। বিশ্বব্যাপী মানুষের মধ্যে প্রাচুর্য বেড়েই চলছে। নতুন নতুন রোগ আত্মপ্রকাশ করছে। এগুলো বন্ধ করার সাধ্য কারো নেই। তবে এই পরিস্থিতিতে আমরা রাসুল (সা.) এর দেখানো পথ অনুসরণ করতে পারি।

মহামারি মূলত আল্লাহর গজব। মহামারি প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, এটি আল্লাহর গজব বা শাস্তি বনি ইসরাঈলের এক গোষ্ঠীর ওপর এসেছিল, তার বাকি অংশই হচ্ছে মহামারি। অতএব, কোথাও মহামারি দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থানরত থাকলে সে জায়গা থেকে চলে এসো না। অন্যদিকে কোনো এলাকায় এটা দেখা দিলে এবং সেখানে তোমরা অবস্থান না করলে সে জায়গায় যেয়ো না। (তিরমিজি, হাদিস : ১০৬৫)

তাই আমাদের উচিত, যেখানে এ ধরনের রোগের প্রকোপ দেখা দেবে, সেখানে যাতায়াত থেকে বিরত থাকা। এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশ সরকারিভাবে করোনা আক্রান্ত দেশগুলোতে যাতায়াতে সতর্কতা জারি করেছে। যেহেতু চিকিৎসকদের মতে এ ভাইরাসটি একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে ছড়ায়। সাধারণত ফ্লু বা ঠাণ্ডা লাগার মতো তীব্র নিউমোনিয়া সিনড্রোমের মতো করেই এ ভাইরাস ছড়ায়।

মহামারি আল্লাহর গজব হলেও এতে আক্রান্ত মৃত ব্যক্তিকে পাপী-জাহান্নামি মনে করা যাবে না। রাসুল (সা.) এর ভাষায় মহামারিতে মারা যাওয়া ব্যক্তিও শহীদ। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, পাঁচ প্রকার মৃত শহীদ—মহামারিতে মৃত, পেটের পীড়ায় মৃত, পানিতে ডুবে মৃত, ধ্বংসস্তুপে চাপা পড়ে মৃত এবং যে আল্লাহর পথে শহীদ হলো। (বুখারি, হাদিস : ২৮২৯)

অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, মহামারিতে মৃত্যু হওয়া প্রতিটি মুসলিমের জন্য শাহাদাত। (বুখারি, হাদিস : ২৮৩০)

অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় তিনবার বলবে ‘বিসমিল্লা-হিল্লাজী লা ইয়াদ্বুররু মাআসমিহি শাইউন ফিল আরদ্বি ওয়ালা ফিস সামা-ই, ওয়াহুয়াস সামী‘উল আলীম’, অর্থ : ‘আল্লাহর নামে যাঁর নামের বরকতে আসমান ও জমিনের কোনো বস্তুই ক্ষতি করতে পারে না, তিনি সর্বশ্রোতা ও মহাজ্ঞানী’; সকাল হওয়া পর্যন্ত তার প্রতি কোনো হঠাৎ বিপদ আসবে না। আর যে তা সকালে তিনবার বলবে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার ওপর কোনো হঠাৎ বিপদ আসবে না। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫০৮৮)

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সব ধরনের মহামারি ও গুনাহ থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

সুত্র:জনমত

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.