সংবাদ শিরোনাম
এবার কুটনৈতিক বিদ্রোহের সামনে পড়ল মিয়ানমারের সামরিক জান্তা  » «   শ্রীরামপুরে স্ত্রী লাকি হত্যাকারী পাষন্ড স্বামী শাহিদ গ্রেফতার  » «   নগরীতে থেকে চুরি হওয়া মোটরসাইকেল কোম্পানীগঞ্জ থেকে উদ্ধার  » «   মাধবপুরে ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানের সংঘর্ষে এক ব্যক্তি নিহত  » «   সিলেটে নতুন করে আরও ১৭ জন করোনায় আক্রান্ত  » «   আজ বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়  » «   বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ: এক কালজয়ী অধ্যায়  » «   জগন্নাথপুরে ধসে পড়া সেতুপরিদর্শন করলেন সচিব নজরুল ইসলাম  » «   সিলেট জেলা অনলাইন প্রেসক্লাব”এর কমিটি গঠন উপলক্ষে আলোচনা সভা  » «   আমেরিকান কন্যা মৌসুমী’র ভয়ঙ্কর প্রতারণার শিকার চিকিৎসক ও প্রবাসী  » «   সুনামগঞ্জে বাবা, স্ত্রী ও কন্যাকে খুনের দায়ে একজনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড  » «   নগরীতে পুলিশের অভিযানে ৭ জুয়ারীকে গ্রেফতার  » «   জগন্নাথপুর-সুনামগঞ্জ সড়কের সেই সেতুর ভেঙে যাওয়া গার্ডার অপসারণ চলছে  » «   ছাতকে পিয়াইন নদী হতে অবৈধ ভাবে বালি উত্তোলন:শতাধিক বসত ঘর বিলিন  » «   ছাতকে রাব্বি হত্যা:ন্যায় বিচার পেতে মামলা করে বিপাকে রুপিয়া “মামলা প্রত্যাহার করতে হুমকি”  » «  

ভাষা আন্দোলন ও সর্বস্তরে বাংলাভাষা প্রচলনে বঙ্গবন্ধু

  • 5
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    5
    Shares

লেখক মো: আব্দুল মালিক::বাঙালির ভাষা আন্দোলন নিছক বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা বা মাতৃভাষা রক্ষা বা জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ বা সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল
না। এটি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের, জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের সর্বোপরি ইসলামের বিধান সমুন্নত রাখার এক মরণপণ জিহাদ। বৃটিশ ভারতে সংখ্যাগরিষ্ট হিন্দু থেকে সংখ্যালগিষ্ট মুসলমানরা যখন ন্যায্য অধিকার পাচ্ছিলেন না তখন বাঙালি মুসলমানদের নেতৃত্বে ঢাকায়, ১৯০৬ সালে নিখিল ভারত মুসলিমলীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান আন্দোলনে বাঙালি মুসলমানদের অবদান ছিল সবার্পেক্ষা বেশি। তথাপিও পাকিস্তান সৃষ্টির পর সংখ্যালগিষ্ট পশ্চিম পাকিস্তানীরা সংখ্যাগরিষ্ট
পূর্ব পাকিস্তানীদের উপর নানা ভাবে বৈষম্যমূলক আচরণ করতে থাকে। তম্মধ্যে অন্যতম ছিল বাঙালির মাতৃভাষা বাংলার উপর আক্রমন।
মাতৃভাষার স্বপক্ষে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে অনেক প্রমাণ রয়েছে। যেমন- ‘আমি প্রত্যেক রাসূলকে তঁার স্বজাতির ভাষাভাষি করে পাঠিয়েছি, তাদের কাছে পরিষ্কার ভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য।’- সূরা ইব্রাহিম ঃ ৪। ‘আর তার নিদর্শনাবলীর মধ্যে অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে।’ সূরা রুমঃ ২২। ‘কোরআন আমি তো
আরবি ভাষায় অবতীর্ণ করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার।’ সূরা ইউসুফ ঃ ২। এভাবে পবিত্র কোরআনে মাতৃভাষার স্বপক্ষে অনেক আয়াত আছে। রাসূল (স.) বলেছেন, ‘তিনটি কারণে আরবি ভাষা আমার কাছে প্রিয়। (১) আল-কোরআনের ভাষা আরবি।
(২) জান্নাতের ভাষা আরবি। (৩) আমার মাতৃভাষা আরবি।’ বুখারী, মুসলিম। এভাবে আরও অনেক হাদিস আছে। যেহেতু রাসূল (স) তঁার মাতৃভাষাকে ভালবাসতেন সেজন্য মাতৃভাষাকে ভালোবাসা নবীর সুন্নত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল
বাঙালি মুসলমানদের জন্য কোরআন সুন্নাকে সমুন্নত রাখার এক পবিত্র জিহাদ। এই জিহাদে সকল বাঙালির সাথে কতিপয় ব্যতিক্রম বাদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও অংশগ্রহণ করেন। পরবতর্ীতে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি হয়েও তিনি সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এখানে সে সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা করা হলো- ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে সমকালীন রাজনীতিবিদসহ ১৪জন ভাষাবিদ সর্বপ্রথম
ভাষা-সহ অন্যান্য দাবি-দাওয়া সংবলিত ২১ দফা দাবি নিয়ে একটি ইশতেহার প্রণয়ন করেন। ঐ ইশতেহারের দ্বিতীয় দাবিটি ছিল রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত। ঐতিহাসিক ঐ ইশতেহারটি একটি ছোট্ট পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়েছিল, যার নাম ‘রাষ্ট্রভাষা-২১ দফা ইস্তেহার-ঐতিহাসিক দলিল’। ঐ পুস্তিকা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত। এ ইশতেহার প্রণয়নে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান ছিল অনস্বীকার্য এবং তিনি ছিলেন অন্যতম স্বাক্ষরদাতা। ৪ জানুয়ারি ১৯৪৮ গঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এ সংগঠনটির ভূমিকা খুবই স্মরণীয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের
নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত ছাত্রলীগের ১০ দফা দাবির মধ্যে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি ছিল অন্যতম। ১১ মার্চ ১৯৪৮ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। এ দিন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়।এটিই ছিল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তথা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম সফল হরতাল। এ হরতালে শেখ মুজিবুর রহমান নেতৃত্ব দেন এবং পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়ে গ্রেপ্তার হন। স্বাধীন পাকিস্তানের রাজনীতিতে
এটাই ছিল তঁার প্রথম গ্রেপ্তার। ১৫ মার্চ ১৯৪৮ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ-এর সাথে তদানীন্তন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের আট দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে জেলখানায় আটক ভাষা আন্দোলনের কর্মী, রাজবন্দিদের
চুক্তিপত্রটি দেখিয়ে অনুমোদন নেওয়া হয়। কারাবন্দি অন্যদের সাথে শেখ মুজিবুর রহমানও চুক্তির শর্ত দেখেন এবং অনুমোদন দেন। এ ঐতিহাসিক চুক্তির ফলে সর্বপ্রথম বাংলাভাষা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি পায় এবং চুক্তির শর্ত
মোতাবেক শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য ভাষা সৈনিকরা কারামুক্ত হন। ১৬ মার্চ ১৯৪৮ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করার লক্ষে এক সাধারণ ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সভায় সভাপতিত্ব করেন সদ্য কারামুক্ত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। সভা শেষে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদ অভিমুখে একটি মিছিল বের হয়। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন ঘোষণা দিলেন একমাত্র ঊর্দুই হবে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা। তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ তরুণ নেতাদের কেউ কেউ জনসমাবেশের মধ্য থেকে তৎক্ষণাৎ এর প্রতিবাদ করেন। ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার কারনে ১৯৪৯ সালে দু’বার গ্রেপ্তার হন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে গ্রেপ্তার হওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন জেলে বন্দি ছিলেন। ফলে স্বাভাবিক কারণেই তিনি ৫২’র ভাষা আন্দোলনে
প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করতে পারেনননি। তবে ঐ সময় জেলে থেকেই নিয়মিত আন্দোলনকারীদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা
দিতেন। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি শেখ মুজিবের জেল মুক্তির আদেশ পাঠ করার
কথা থাকলেও খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন, “ঊর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা”। এ ঘোষণার পর জেলে থাকা স্বত্ত্বেও প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিয়ে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদকে পরোক্ষভাবে পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আয়োজনে তিনি সাহসী ভূমিকা রাখেন। এরপরই ২১শে ফেব্রুয়ারি ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সময়ে শেখ মুজিব জেলে অবস্থান করেই ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন পালনের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর এই অনশন ১৩
দিন স্থায়ী ছিল। ২৬ ফেব্রুয়ারি তাঁকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে কাজে লাগিয়ে ৪ ডিসেম্বর ১৯৫৩ যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। যুক্তফ্রন্ট প্রণীত ২১ দফার প্রথম দফা ছিল ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই।’ ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের কৃষি, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান সমকালীন রাজনীতি এবং বাংলা ভাষার উন্নয়নে অবদান রাখেন। ১৭ জানুয়ারি ১৯৫৬ আইন সভার অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু সংসদের দৈনন্দিন কার্যসূচি
বাংলা ভাষায় মুদ্রণ করার এবং ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ আইনসভার অধিবেশনে বাংলাকে
রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২৩ মার্চ ১৯৫৬ পাকিস্তান সরকার কতর্ৃক গৃহীত প্রথম সংবিধানে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদর্ী
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের বিপক্ষে ছিলেন। তিনি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষেও বিবৃতি দেন। শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দীর এ মত পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে তাঁর সমর্থন আদায় করেন। শেখ মুজিবুর রহমানের বাংলা ভাষার প্রতি গভীর দরদ ও অসীম রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কারনে
শহীদ সোহরাওয়ার্দী শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকেসমর্থন করে একটি বিবৃতি দেন। ঐ বিবৃতিটি ২৯ জুন ১৯৫২ সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ প্রসঙ্গে মাওলানা ভাসানী একটি বিবৃতি দেন।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘বাংলাভাষার পক্ষে শহীদ সোরাওয়াদর্ীর মত পরিবর্তনে মুজিব সক্ষম না হলে শুধু ভাষা আন্দোলন নয়, আওয়ামীলীগের ভবিষ্যত ও অনিশ্চিত হয়ে পড়তো।’ ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের জবানবন্দি
নিম্নরুপ-
“আমি হাসপাতালে আছি। সন্ধ্যায় মোহাম্মদ তোয়াহা ও অলি আহাদ দেখা করতে
আসে। আমার কেবিনের একটা জানালা ছিল ওয়ার্ডের দিকে। আমি ওদের রাত একটার
পরে আসতে বললাম। আরও বললাম, খালেক নেওয়াজ, কাজী গোলাম মাহাবুব আরও
কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকে খবর দিতে। দরজার বাইরে আইবিরা পাহারা দিত। রাতে
অনেকে ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন পেছনের বারান্দায় ওরা পাঁচ- সাতজন এসেছে। আমি
অনেক রাতে একা হাঁটাচলা করতাম । রাতে কেউ আসেনা বলে কেউ কিছু বলত না।
পুলিশরা চুপচাপ পড়ে থাকে, কারণ জানে আমি ভাগব না। গোয়েন্দা কর্মচারী
একপাশে বসে ঝিমায়। বারান্দায় বসে আলাপ হলো এবং আমি বললাম, সর্বদলীয়
সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে। আওয়ামী লীগ নেতাদেরও খবর দিয়েছি। ছাত্রলীগই তখন
ছাত্রদের মধ্যে একমাত্র জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান। ছাত্রলীগ নেতারা রাজি হলো। অলি আহাদ ও
তোয়াহা বলল, যুবলীগও রাজি হবে। আবার ষড়যন্ত্র চলছে বাংলা ভাষার দাবিকে নস্যাৎ
করার। এখন প্রতিবাদ না করলে কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলিগ লীগ উর্দুর পক্ষে প্রস্তাব
পাস করে নেবে। নাজিমুদ্দীন সাহেব উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথাই বলেন নাই,
অনেক নতুন নতুন যুক্তিতর্ক দিয়েছেন। অলি আহাদ যদিও আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের
সদস্য হয় নাই, তবুও আমাকে ব্যক্তিগতভাবে খুবই শ্রদ্ধা করত ও ভালোবাসত। আরও
বললাম, ‘খবর পেয়েছি, আমাকে শীঘ্রই আবার জেলে পাঠিয়ে দিবে, কারণ আমি
নাকি হাসপাতালে বসে রাজনীতি করছি। তোমরা আগামীকাল রাতেও আবার এসো।
আরও দু’একজন ছাত্রলীগ নেতাকে আসতে বললাম। শওকত মিয়া ও কয়েকজন আওয়ামী
লীগ কর্মীকেও দেখা করতে বললাম। পরের দিন রাতে এক এক করে অনেকেই আসল।
সেখানেই ঠিক হলো আগামী ২১ শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে এবং সভা করে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে হবে।” (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ১৯৬,
১৯৭)।
ভাষা আন্দোলনে ছাত্রলীগের অবদান উল্লেখ করতে গিয়ে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৩ সালে তাজমহল সিনেমা হলে সংগঠনটির কাউন্সিলে
সভাপতির বক্তব্যে বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ভাষা আন্দোলনে যে নেতৃত্ব
দিয়েছে, তা পূর্ববাংলার লোক কোনদিন ভুলতে পারবে না। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার
জন্য যে ত্যাগ স্বীকার আপনারা করেছেন, এ দেশের মানুষ চিরজীবন তা ভুলতে পারবে
না। আপনারাই (ছাত্রলীগ) এ দেশে বিরোধী দল সৃষ্টি করেছেন। শক্তিশালী বিরোধী দল না
থাকলে গণতন্ত্র চলতে পারে না।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ১২৬)।
১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আমি ঘোষনা করছি আমাদের
হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে সেদিন থেকেই দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে।
বাংলা ভাষার পন্ডিতেরা পরিভাষা তৈরি করবেন তারপরে বাংলা ভাষা চালু হবে, তা হবে না।
পরিভাষাবিদেরা যত খুশি গবেষণা করুন, আমরা ক্ষমতা হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই
বাংলা ভাষা চালু করে দেব, সে বাংলা যদি ভুল হয় তবে ভুলই চালু হবে, পরে তা সংশোধন
করা হবে।” শামসুজ্জামান খান, বাংলার বাণী, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৫।
বঙ্গবন্ধু তাঁর কথা রেখেছিলেন। সর্বস্তরে যাতে বাংলা ভাষা চালু হয়, সেজন্য তিনি নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি সংশ্লিষ্ট সকলকে বাংলা ভাষায় কাজ করার নির্দেশ
দিয়েছিলেন। দৈনিক বাংলা, ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২। বাংলা ভাষাকে কাঙ্খিত স্তরে নিয়ে
যাওয়ার জন্য খুব কম সময় পাওয়া সত্ত্বেও তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
নিয়েছিলেন, যেগুলোর মধ্য থেকে মাত্র দুটির উল্লেখই যথেষ্ট: (এক) তিনি বাংলা ভাষায়
দেশের সংবিধান রচনা করেছিলেন, (দুই) ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করেছিলেন। বাংলাদেশের সংবিধানের একেবারে সূচনাতেই লেখা হয়, “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা”। তিন শব্দের এই বাক্যটি সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে লিখা হয়েছে। ভারতের সংবিধানে ভাষার প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে ৩৪৩ নং অনুচ্ছেদে এবং পাকিস্তানে ১৯৭৩ সালে গৃহীত সে দেশের সংবিধানে ভাষার প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয় ২৫১ নং অনুচ্ছেদে। বাংলাদেশের সংবিধানে ভাষাকে কতোটা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়েছে, এ থেকে তা অনুমান করা যায়। বাংলাদেশের সংবিধানের এই চেতনা এবং বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ বাংলাদেশের সর্বত্র প্রচারিত হওয়া সত্ত্বেও সরকারি কাজকর্মে সর্বত্র বাংলা ভাষা ব্যবহারে কিছু প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়। সেই প্রতিবন্ধকতা ছিলো মূলত দ্বিবিধ: যান্ত্রিক ও মানসিক। একদিকে সরকারি কাজকর্মের জন্য দেশের সর্বত্র যে পরিমাণ বাংলা টাইপ রাইটার প্রয়োজন ছিল, সরকার তা সরবরাহ করতে পারেনি। অদ্যদিকে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাগণ, যারা বহু কষ্টে ইংরেজি ভাষা আয়ত্ত করে নিজেদের একটি আলাদা শ্রেণিতে পরিণত করেছেন, তারা সেই ভাষা ত্যাগ করে সাধারণ মানুষের ভাষা ব্যবহার করতে সংকোচ বোধ করছিলেন। নানা ধরণের অজুহাত তুলে ধরে তারা সর্বোচ্চ পর্যায়ে ইংরেজি ভাষা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম অজুহাত ছিল পরিভাষার। উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এই মনোভাব যে বাংলা ভাষা বিকাশের পক্ষে চরম অন্তরায়, কিছুটা দেরিতে হলেও বঙ্গবন্ধু তা উপলব্ধি করতে পারেন। তাই ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ তিনি একটি কঠোর নির্দেশ জারি করেন। নির্দেশটি ছিল নিম্নরূপ: রাষ্ট্রপতির সচিবালয়, গণভবন, ঢাকা সংখ্যা ৩০/১২/৭৫, সাধারণÑ৭২৯/১ (৪০০) ১২ই মার্চ, ১৯৭৫ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। বাংলা আমাদের জাতীয় ভাষা তবুও অত্যন্ত দুঃখের সাথে লক্ষ্য করেছি যে, স্বাধীনতার তিন বৎসর পরেও অধিকাংশ অফিস-
আদালতে মাতৃভাষার পরিবর্তে বিজাতীয় ইংরেজি ভাষায় নথিপত্র লেখা হচ্ছে। মাতৃভাষার প্রতি যার ভালোবাসা নেই দেশের প্রতি যে তার ভালোবাসা আছে এ কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। দীর্ঘ তিন বৎসর অপেক্ষার পরও বাংলাদেশের বাঙ্গালী কর্মচারীরা ইংরেজি ভাষায় নথিতে লিখবেন সেটা অসহনীয়। এ সম্পর্কে আমার পূর্ববর্তী নির্দেশ সত্ত্বেও এ ধরনের অনিয়ম চলছে। আর এ উচ্ছৃঙ্খলতা চলতে দেয়া যেতে পারে না। এ আদেশ জারী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সকল সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও আধা- সরকারী অফিসসমূহে কেবলমাত্র বাংলার মাধ্যমে নথিপত্র ও চিঠিপত্র লেখা হবে। এ বিষয়ে কোন অন্যথা হলে উক্ত বিধি লংঘনকারীকে আইনানুগ শাস্তি দেবার ব্যবস্থা করা হবে। বিভিন্ন অফিস-আদালতের কর্তা ব্যক্তিগণ সতর্কতার সাথে এ আদেশ কার্যকরী করবেন এবং আদেশ লংঘনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করবেন। তবে কোন বিদেশী সংস্থা বা সরকারের সাথে পত্র যোগাযোগ করার সময় বাংলার সাথে
ইংরেজী অথবা সংশ্লিষ্ট ভাষায় একটি প্রতিলিপি পাঠানো প্রয়োজন। তেমনিভাবে বিদেশের কোন সরকার বা সংস্থার সাথে চুক্তি সম্পাদনের সময়ও বাংলার সাথে অনুমোদিত ইংরেজি বা সংশ্লিষ্ট ভাষার প্রতিলিপি ব্যবহার করা চলবে। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকরী হবে। শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি বাংলা ভাষা এবং ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর এ অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে
থাকবে।
মো. আব্দুল মালিক
শিক্ষক ও কলামিস্ট এবং
সহ-সভাপতি
বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদ, সিলেট জেলা।
সাধারণ সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু গবেষণা সংসদ, সিলেট জেলা।


  • 5
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    5
    Shares

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.