সংবাদ শিরোনাম
সিলেটে ইফতার বিতরণ অব্যাহত রেখেছে মহানগর যুবলীগ  » «   ইলিয়াস আলীকে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি সিলেট বিএনপি নেতাদের  » «   তাহিরপুরের পূর্ব শত্রুতার জেরে এক নিরীহ ব্যক্তিকে পিঠিয়ে রক্তাক্ত,থানায় অভিযোগ  » «   প্রাকৃতিক দুযোর্গ না হলে চলতি মাসের মধ্যে সুনামগঞ্জের হাওরগুলোর ধান কাটা শেষ হবে,বিভাগীয় কমিশনার   » «   জগন্নাথপুর বিএনপি পরিবারের মিলাদ ও দোয়া মাহফিল  » «   মামুনুল হক সাত দিনের রিমান্ডে  » «   ‘চলমান লকডাউনের মেয়াদ ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ল’  » «   লকডাউন:নগরীতে রিকশা চালকদেরও শাস্তির মুখোমুখি  » «   শ্রীমঙ্গলে তিন গাড়িসহ চোরাই কাঠ জব্দ, কারাগারে তিন পাচারকারি  » «   বিয়ানীবাজারে করোনা আক্রান্ত বেড়ে ৪৯৪  » «   জগন্নাথপুরে এক বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি গ্রেফতার  » «   জগন্নাথপুরে আরো দুজন করোনা শনাক্ত: মোট আক্রান্ত ২০৩  » «   গরীব দুস্থ ও অসহায়দেরকে নিয়ে মাপসাস’র ইফতার মাহফিল সম্পন্ন  » «   শ্রীমঙ্গলের ইফতারী বিক্রীকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের সংঘর্ষে পুলিশসহ আহত ৭  » «   সিলেটে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রচারণা  » «  

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ: এক কালজয়ী অধ্যায়

  • 5
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    5
    Shares

লেখক মো: আব্দুল মালিক::সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি,
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ
তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বর্তমান সোহরওয়ার্দী উদ্যানে দশ
লক্ষাধিক জনতার এক সমাবেশে যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন তা
তাৎক্ষণিক হলেও এর পটভূমি তাৎক্ষণিক ছিল না। এই ভাষনের পটভূমি রচিত
হয়েছে ১৯০ বছরের বৃটিশ উপনিবেশিক ও ২৪ বছরের পশ্চিমা শাসন ও
শোষণ থেকে মুক্তির বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের পটভূমিতে। এই
পটভূমি তৈরিতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত কাজ করে প্রেসিডেন্ট
ইয়াহিয়ার ১লা মার্চের বেতার ভাষণ। এই ভাষণে তিনি ৩রা মার্চ
অনুষ্ঠিতব্য সংসদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেন।
তাৎক্ষণিক এর তীব্র প্রতিক্রয়া হয়। ঐদিন বিকালে এক সমাবেশে
বঙ্গবন্ধু ২ ও ৩ মার্চের কর্মসূচী ঘোষনা করে বলেন, ‘৭ মার্চ
রেসকোর্স ময়দানে জনসভা হবে। ঐ জনসভায় আমি পরবর্তী
কর্মসূচী ঘোষনা করব। ৩রা মার্চ থেকে ৬ই মার্চ পর্যন্ত বঙ্গন্ধুর
নির্দেশে প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সর্বাত্মক
হরতাল পালিত হয়। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু কী বলবেন এ নিয়ে সমগ্র জাতি,
পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী ও বিশ্ববাসীর মধ্যে চরম উদ্বেগ উৎকষ্ঠা বিরাজ
করছে।
বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষণ যখন দেন তখন চরমপন্থী রাজনীতিবিদরা
স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য একদিকে চাপ দিচ্ছেন। অন্যদিকে মধ্যপন্থী,
নরমপন্থী রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা এই মুহুর্তে স্বাধীনতা ঘোষণার
বিপক্ষে। অপরপক্ষে পাকিস্তান সরকার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে বঙ্গবন্ধু
স্বাধীনতা ঘোষণা করলেই সভাস্থলে বিমান হামলা করবে। উপরন্ত
বিশ্বরাজনীতির তথাকথিত মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে তাদের
রাষ্ট্রদূত যোসেফ ফারল্যান্ড বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করে তাঁকে বলে গেছেন
বঙ্গবন্ধু যেন এই মুহুর্তে স্বাধীনতা ঘোষণা না করেন। এটা ছিল
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রচ্ছন্ন হুমকি। অভ্যন্তরীন ও
আন্তার্জাতিক এমন পরিস্থিতে বঙ্গবন্ধু খাতা কলম ছাড়া তাঁর অমর
কবিতাখানি পাঠ করেন। ১৮/১৯ মিনিটের এই ভাষণে ১১০৫টি শব্দ ছিল।
এই শব্দগুলো উচ্চারনের মধ্য দিয়ে তিনি পূবার্পর সমস্ত পরিস্থিতি
বর্ণনা করেন। বাঙালি জাতিকে প্রয়োজনীয় দিক নিদের্শনা দিয়ে
কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাঁর এই কৌশলী ভাষনে পরস্পর বিরোধী
উভয় পক্ষ খুশি হন এবং পাকিস্তান সরকার বা তার দোসররা বঙ্গবন্ধুকে
স্বাধীনতা ঘোষণার দায়ে দোষী সাব্যস্থ করতে পারেনি। এ প্রসঙ্গে ড.
কামাল হোসেন লিখেছেন,‘৭ মার্চ শেখ মুজিব কী বলবেন তা ঠিক
করার জন্য ৬ মার্চ আওয়ামী লীগের কার্যনিবার্হী সভা। সারা দেশে
প্রত্যাশা দেখা দিয়েছিল যে, ৭ মার্চ শেখ মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা
দেবেন। বস্তুত, ছাত্র ও যুবসমাজ এ ধরণের ঘোষণার প্রবল পক্ষপাতী ছিল। ৭
মার্চ নাগাদ দলীয় সদস্যদের মধ্যে সামান্যই সন্দেহ ছিল যে, ছাত্রসমাজ,
যুবসম্প্রদায় এবং রাজনীতি-সচেতন ব্যাপক জনগণের কাছে
স্বাধীনতার চেয়ে কম কোনো কিছুই গ্রহণযোগ্য হবে না।’
সুতরাং দল ও দলীয় নেতা শেখ মুজিবের উপর দায়িত্ব এসে পড়েছিল এমন
কিছু না বলা, যা পাকিস্তানি পক্ষকে তখনই অজুহাত দেবে অপ্রস্তুত
জনগণের ওপর ঝঁাপিয়ে পড়ার। আবার একই সঙ্গে চাঙ্গা রাখতে হবে
আন্দোলন ও জনগণকে। এ ভারসাম্য বজায় রাখা নিতান্ত সহজ কাজ ছিল
না। এছাড়া মনে রাখতে হবে তখনও তাঁকে কাজ করতে হচ্ছিল পাকিস্তান
রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে থেকে। যেখানে তাঁর অবস্থান ছিল সংসদে
সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে। এখন ব্যাপারটি যত সহজ মনে হচ্ছে
তখন নিশ্চয়ই তা ছিল না। এছাড়াও বিশেষ করে ছাত্রদের প্রবল চাপ ছিল।
তারাই ইতিমধ্যে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে ফেলেছেন। আন্দোলনে
তারাই ছিলেন মূল চালিকাশক্তি। তাদের বিরূপ করা সম্ভব ছিল না।’
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ঐতিহাসিক ৭ মার্চ।
ওই দিন কত মানুষ, কত মত, কত কাগজ, কত পরামর্শ। আব্বা সবই ধৈর্য
সহকারে শুনেছেন। সব কাগজই গ্রহণ করেছেন। সারাটা দিন এভাবেই
কেটেছে । যখন জনসভায় যাওয়ার সময় হল তার কিছুক্ষণ পূর্বে আব্বা
কাপড় পরে তৈরি হবেন । মা আব্বাকে ঘরে নিয়ে এলেন। দরজাটা বন্ধ করে
দিয়ে আব্বাকে বললেন, ১৫ মিনিট চুপচাপ শুয়ে থাকার জন্য। আমি
আব্বার মাথার কাছে বসে মাথাটা টিপে দিচ্ছিলাম। মা বেতের
মোড়াটা টেনে আব্বার কাছে বসলেন। হাতে পানদান, ধীরে ধীরে পান
বানাচ্ছেন আর কথা বলছেন। আমার মা আব্বাকে বললেন, সমগ্র দেশের
মানুষ তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সবার ভাগ্য আজ তোমার
উপর নির্ভর করছে। তুমি আজ একটা কথা মনে রাখবে, সামনে তোমার
লাঠি, পেছনে বন্দুক। তোমার মনে যে কথা আছে তুমি তাই বলবে।
অনেকে অনেক কথা বলতে বলেছে। তোমার কথার উপর সামনের অগনিত
মানুষের ভাগ্য জড়িত, তাই নিজে যেভাবে যা বলতে চাও নিজের থেকে
বলবে। তুমি যা বলবে, সেটাই ঠিক হবে। দেশের মানুষ তোমাকে
ভালবাসে, ভরসা করে। ভাষণটি ২৩ মিনিটের ছিল, তবে ১৮-১৯ মিনিটের
মতো রেকর্ড করা হয়েছিল।’
বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তিন দেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা,
আব্দুল গাফফার চৌধুরী একুশের কালজয়ী গানের রচয়িতা। এভাবে
বিশ্বের অনেক কবি অনেক অমর কবিতা রচনা করেছেন। কিন্তু তাদের
সাথে বঙ্গবন্ধুর পার্থক্য হলো-উনারা লিখেছেন চেয়ার টেবিলে বসে,
কাগজ কলম হাতে নিয়ে, অনেক সময় ধরে, অনেক বার কাট ছাট করে। আর
বঙ্গবন্ধু তা রচনা করেছেন লক্ষ লক্ষ জনতার সামনে, আগ্নেয়গিরির
অগ্নুতপাত সম সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে তাৎক্ষনিক ভাবে। তঁার সামনে লাটি
হাতে মারমুখি জনতা, পিছনে বন্দুক হাতে পুলিশ, মাথার উপরে
পাকিস্তানী যুদ্ধ বিমান।
এই জন্য ৭ই মার্চের এই অমর কবিতা সম্পর্কে অনেকে অনেক অভিমত
দিয়েছেন। কবি নির্মলেন্দু ঘুণ বলেছেন, ‘এই ভাষণ একটি মহাকাব্য।
আর এই ভাষণটি যিনি দিয়েছেন, তিনি একজন মহাকবি।’ আব্দুল
গাফফার চৌধুরী বলেন, ‘এই ভাষণ বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্রাকৃতির
মহাকাব্য। কিন্তু ১৬ কোটি বাঙালির হৃদয়ে মুদ্রিত।’ লন্ডনের সানডে
টাইমস বঙ্গবন্ধুকে আখ্যা দিয়েছিলো “অ ঢ়ড়বঃ ড়ভ ঢ়ড়ষরঃরপং্থ হিসেবে।
কথাটা তাৎপর্যপূর্ণ। রাজনীতি একটি জাগতিক ও লৌকিক ব্যাপার।
কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে অলৌকিকত্ব দান করেছেন। ফরাসি
দার্শনিক আঁদ্রেজিত বাংলাদেশ হানাদারমুক্ত হওয়ার পর ঢাকায়
এসেছিলেন। তিনি একটি বুদ্ধিজীবি সমাবেশে বলেছিলেন,
‘তোমাদের ৭ই মার্চের দিনটি ও ভাষণটি শুধু ঐতিহাসিক দিন এবং
ঐতিহাসিক ভাষণ নয়, এটি ধ্রুপদী দিন ও ধ্রুপদী ভাষণ, যেদিন এ
ভাষণের গর্ভ থেকে একটি স্বাধীন জাতির জন্ম হয়েছে। ফ্রান্সে দূর-
অতীতে বাস্তিল দুর্গ ভাঙার দিনটিকে বলা হয় ধ্রুপদী দিন। এই
দিনটির গর্ভেই একটি বিপ্লবের জন্ম এবং যে বিপ্লব থেকে ফরাসি
প্রজাতন্ত্রের উদ্ভব।’
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ, ‘স্বতঃস্ফুর্ত, স্বতোৎসারিত অমর কাব্য,
অসাধারণ পংক্তি, যার অন্তমিল, ধ্বনি-ব্যঞ্জনা, শব্দ-ঝংকার যুগ যুগ ধরে
মোহিত আবেগায়িত বিমুগ্ধ করে, পৌছে দেবে এক মহত্ত্বর বোধে,
সে এক তুলনাহীন শব্দচয়ন, স্বতঃস্ফুর্ত সাবলীলতায় লেখা অন্যবদ্য কবিতা,
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম
স্বাধীনতার সংগ্রাম’। মাত্রা, ছন্দে, শব্দ গঠনে এ এক অসামান্য
কবিতা, এই উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে এই ঘোষণা মূহুর্তেই আবহমান
বাংলার ও বাঙালির জীবন যেন স্পন্দিত ও প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে, জেগে
উঠে তার হাজার বছরের ইতিহাস, সভ্যতা, তার মনোজগৎ, এক সঙ্গে
গেয়ে উঠে বাংলার সব পাখি, প্রস্ফুটির হয়ে ওঠে সব ফুল, ভরে ওঠে সব
নদী, আমরা মহাসাগরের কলধ্বনি শুনতে পাই, আমাদের সাহসে, শৌর্যে,
শক্তিতে দাঁড় করিয়ে দেয় সর্বশ্রেষ্ট মানবিক কর্তব্যবোধের
পুরোভাগে, বাঙালির গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের পরম ত্যাগ ও বীরত্বের মুখে,
আমরা আমাদের চেয়ে অনেক বড় হয়ে উঠি।’
‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ একটি জাতির-জনগোষ্ঠির মুক্তির কালজয়ী
সৃষ্টি, এক মহাকাব্য। বহুমাত্রিকতায় তা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। শুধু বাঙালির
জন্যই নয়, বিশ্ব মানবতার জন্যও অবস্মিরণীয়, অনুকরণীয় এক
মহামূল্যবান দলিল বা সম্পদ। ইউনেস্কোর সিদ্ধান্তে এটিই স্বীকৃত।
জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো
প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক দ্বি-বার্ষিক সম্মোলনে ৩০ অক্টোবর ২০১৭
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে ‘বিশ্ব ঐতিহ্যের দলিল’
হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সংস্থাটির ‘মেমোরি অব দ্যা ওয়ার্ল্ড
ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার’-এ অন্তভুর্ক্ত করেছে। ১৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি
আন্তার্জাতিক উপদেষ্টা/বিশেষজ্ঞ কমিটি কতর্ৃক দু’বছর ধরে
প্রামাণ্য দালিলিক যাঁচাই-বাছাই শেষে ইউনেস্কোর সেক্রেটারি
জেনারেলের সম্মতিক্রমে এটি নির্বাহী কমিটি কতর্ৃক
চূড়ান্তাভাবে গৃহীত হয়। দীর্ঘ ৪৬ বছর পর হলেও জাতিসংঘের মতো
বিশ্বসংস্থার এ সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এর
ফলে বাঙালির ইতিহাসের মহানায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমানের বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রণোদনাময়ী ৭ই মার্চের
ঐতিহাসিক ভাষণ বিশ্বাব্যাপি মানবজাতির মূল্যবান ও ঐতিহ্যপূর্ণ
সম্পদ হিসেবে স্বীকৃত ও গৃহীত হলো। স্বাধীনতার জন্য
আত্নোৎসর্গকৃত ৩০ লাখ শহীদ আর সম্ভ্রম হারানো কয়েক লাখ মা-
বোনসহ আমাদের সবার জন্য এটি এক মহা আনন্দ ও বিরল সম্মানের
ঘটনা। স্মর্তব্য, ১৯৯৯ সালে ইউনেষ্কো আমাদের ২১ ফেব্রুয়ারি মহান
ভাষা-শহীদ দিবসকে ‘আন্তার্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে
স্বীকৃতি দেয়। ফলে এখন সারাবিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভাষাভাষি
জনগোষ্ঠির নিজ ভাষার অধিকার সংরক্ষণের প্রতীক হিসেবে দিবসটি
পালিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওই ভাষা-আন্দোলনে শুধু
সংগঠকের ভূমিকাই পালন করেননি, তিনি ছিলেন ভাষা-আন্দোলনের
প্রথম কারাবন্দিদের অন্যতম। উল্লেখ্য, ১৯৯২ সাল থেকে ইউনেস্কো বিশ্ব
ঐতিহ্যের স্বীকৃতি ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে আসছে। এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
হচ্ছে, ইউনেস্কোর সেক্রেটারি জেনারেল ইরিনা বকোভার ভাষায়, ‘আমি
গভীর ও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, দালিলিক ঐতিহ্য ও স্মৃতি সংরক্ষণের জণ্য
কর্মসূচি পরিচালিত হওয়া উচিত, যাতে করে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
প্রজন্ম সংলাপ,আন্তার্জাতিক সহযোগিতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও
শান্তির চেতনা মনে লালন করতে পারে। ‘যুদ্ধ-বিগ্রহ, ধর্মীয় উন্মদনা,
লুষ্ঠন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন ইত্যাদি কারণে দেশে-দেশে বিশ্ব ঐতিহ্য
সম্পদ বিনষ্ট বা ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে। আবার সম্পদের অপ্রতুলতার কারণেও
যথাযথভাবে তা সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। সে কারণেও তা বিনষ্ট বা
বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। এসব দিক বিবেচনায়
ইউনেস্কোর এ কর্মসূচির গুরুত্ব অপরিসীমা। গ্রিক নগররাষ্ট্র এথেন্সের
রাষ্ট্রনায়ক থেকে শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড
রিগানের ১৯৮৭ সালে বার্লিনে দুই জার্মানির মধ্যকার বিভক্তির দেয়াল
(বার্লিন ওয়াল) ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করার আহ্বান সংবলিত ভাষণ
পর্যন্ত আড়াই হাজার বছরের বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি প্রভাব
বিস্তারকারি ৪১ জন সামরিক-বেসামরিক জাতীয় বীরের বিখ্যাত ভাষণ
নিয়ে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ঔধপড়ন ঋ ঋরবষফ, ‘ডব ঝযধষষ ঋরমযঃ ঃড় ঞযব
ইবধপযবং. ঞযব ঝঢ়ববপযবং ঞযধঃ ওহংঢ়রৎবফ ঐরংঃড়ৎু শিরোনামে একটি গ্রন্থ
২০১৩ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশ করেন। এ গ্রন্থে অন্যান্যের মধ্যে
আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট (মেসিডোনিয়া, প্রাচীন গ্রিস),
জুলিয়াস সিজার (ইতালি), অলিভার ক্রমওযেল (ইংল্যান্ড), জর্জ ওয়াশিংটন
(যুক্তরাষ্ট্র), নেপোলিয়ন বোনাপার্ট (ফ্রান্স), যোসেফ গ্যারিবোল্ডি
(ইতালি), আব্রাহাম লিংকন (যুক্তরাষ্ট্র), ভ্লাদিমির লেনিন (রাশিয়া),
উইড্রো উইলসন (যুক্তরাষ্ট্র), উইনস্টন চার্চিল (যুক্তরাজ্য), ফ্রাষ্কলিন
রুজভেল্ট (যুক্তরাষ্ট্র) চার্লস দ্য গল (ফ্রান্স), মাও সেতুং (গণচীন), হো চি
মিন (ভিয়েতনাম) প্রমুখ বিশ্ব নেতাদের বিখ্যাত ভাষণের পাশাপাশি
স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের
ভাষণ অন্তভুর্ক্ত হয়েছে।’ এটা কম গৌরবের কথা নয়। এই কালজয়ী ভাষনের
স্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী মুজিব বর্ষ
বাংলাদেশসহ জাতিসংঘের ১৯৩টি দেশ এক সঙ্গে পালন করছে। এমনটি
অন্য কোনো বিশ্বনেতার ক্ষেত্রে এযাবত ঘটেনি। এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমান এক অনন্য অসাধারন ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিরজ্ঞীব হয়ে
থাকবেন।
বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি এই গৌরবের অংশীদার।
মো: আব্দুল মালিক
শিক্ষক, কলামিস্ট
সাধারণ সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু গবেষণা সংসদ, সিলেট জেলা শাখা।
সহ সভাপতি, বঙ্গবন্ধু লেখক পরিষদ সিলেট জেলা শাখা
মোবাইল: ০১৭৪৯৭৫০৫৩৫


  • 5
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    5
    Shares

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.