সংবাদ শিরোনাম
এডিশন্যাল ডি আই জি কে জেলা শ্রমিক ঐক্য পরিষদের বিদায় সংবর্ধনা ও ক্রেষ্ট প্রদান  » «   আউশকান্দি কলেজিয়েট স্কুলে বখাটেদের উৎপাত বেড়ে গেছে!ছাত্রী ও অভিভাবকরা আতংকিত  » «   সুনামগঞ্জ জেলা ও দিরাই উপজেলা শিক্ষা অফিসারের বিরুদ্ধে দুদকে ঘুষ-দূর্নীতি ও অর্থ কেলেংকারীর অভিযোগ   » «   মাস খানেক পরই বিদ্যুৎ ঘাটতিসহ সবকিছুই ঠিক হয়ে যাবে-পরিকল্পনা মন্ত্রী মান্নান  » «   ওসমানীনগরে পরিমাপে পেট্রোল কম দেয়ায় সুপ্রীম ও আবীর ফিলিং স্টেশনকে জরিমানা  » «   জগন্নাথপুরে এক কৃষক হত্যা মামলায় ১ জনের আমৃত্যু ও ৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড  » «   সিলেটের ওসমানীনগরে মা-মেয়েকে জোরপূর্বক ধর্ষণের অভিযোগ  » «   জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির অযৌক্তিক সিদ্বান্ত-বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল  » «   দেশের সংকট নিরসনের জন্য আওয়ামীলীগকে বিতাড়িত করার বিকল্প নেই :খন্দকার মুক্তাদির  » «   চুনারুঘাটে ছেলের হাতে মা খুন,ছেলে আটক  » «   জৈন্তাপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২  » «   দোয়ারাবাজারে ভারতীয় মালামালসহ আটক ২   » «   ওসমানীনগর থানার ওসি অথর্ব ও দুর্নীতিবাজ-মোকাব্বির খান এমপি  » «   ভোলায় পুলিশী ন্যাক্কারজনক ঘটনায় সিলেটে যুবদলের বিক্ষোভ মিছিল  » «   সিলেটে ঘুষ ছাড়া সহজে কারো পাসপোর্ট হয়না: ব্যবস্থা নিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চিঠি  » «  

নবীগঞ্জে আওয়ামীলীগ নেতার সুদ বাণিজ্যে ৭০ পরিবার দিশেহারা

11সিলেটপোস্ট রিপোর্ট :নবীগঞ্জ উপজেলার দিনারপুর পাহাড়ি এলাকার রামলোহ গ্রামের বজলু মিয়া। থাকতেন সৌদি আরবে। বিদেশ থেকে দেশে আসার পর জরুরী প্রয়োজনে গ্রামের সুদের কারবারী আব্দুল মালেক এর কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। শর্ত মূল টাকা ফেরত দেয়ার পূর্ব পর্যন্ত মাসে ৮ হাজার টাকার কিস্তি প্রদান করতে হবে। জামানত হিসাবে দেন শুধুমাত্র দস্তখত করা একটি খালি চেক। কিস্তির টাকা প্রদানে একটু এদিক সেদিক হওয়ায় বাড়তে তাকে সুদের পরিমান। পরে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা দিয়ে সালিশ বিচারের মাধ্যমে মুক্তি পান সুদের খপ্পর থেকে। এই টাকা প্রদান করত গিয়ে তার পৈত্রিক ১৪ বিঘা জমি বিক্রি করেন। সব কিছু হারানোর পরও সুদের খপ্পর থেকে মুক্তির আনন্দে তিনি গরু জবাই করে শিরন্নি করেন এলাকায়। বজলু মিয়ার মত ওই এলাকার বহু লোক আব্দুল মালেক এর খপ্পরে পড়ে সর্বশান্ত হয়েছেন। অনেকেই জমি ও গাড়ী বিক্রি করে শোধ করেছেন ঋণের টাকা। আবার কেউ কেউ বাড়ী পর্যন্ত বিক্রি করে এলাকা ছেড়েছেন। অনেকেই জামানত দেয়া চেকের কারনে বহুগুন টাকার মামলার শিকার হয়েছেন।রামলোহ গ্রামের ছাও মিয়ার পুত্র আব্দুল মালেক থাকতেন সৌদি আরবে। ২৫ বছর পর ৭/৮ বছর পূর্বে দেশে এসে শুরু করেন সুদের ব্যবসা। প্রথমে ছিল অল্প পরিমাণে। তবে সেই টাকা বৃদ্ধি পেয়ে এখন তার মূলধন হয়েছে কয়েক কোটি টাকা।সরেজমিনে ওই এলাকায় গেলে আব্দুল মালেককে পাওয়া যায় একটি মোরগের খামাড়ে। যেটি আবার সুদের জন্য তার দখলকৃত জায়গায় তৈরি করা হয়েছে। রামলোহ গ্রামের হারুনুর রশিদ ১ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে কয়েক কিস্তি দেয়ার পর আর টাকা দিতে পারেননি। ফলে তার মায়ের নামে রেজিস্ট্রি করা সাড়ে ৪ লাখ টাকা মূল্যের ১০ শতক জমি দখলে নিয়ে মোরগের খামাড় গড়ে তুলেন তিনি। তার সাথে পাওয়া যায় সুদের ব্যবসার সহযোগী ও তার দ্বিতীয় স্ত্রীর বড় ভাই রাশেদকে।আব্দুল মালেক প্রথমেই পরিচয় দেন তিনি জেলা আওয়মীলীগের কাউন্সিলার ও গজনাইপুর ইউনিযন আওয়ামীলীগের সভাপতি। কিন্তু পাশেই সালিশ বিচারে থাকা গজনাইপুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান আবুল খায়ের গোলাপ আছেন জানতে পেরে পরে নিজেকে ৬নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সভাপতি এবং নবীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের কাউন্সিলার হিসাবে পরিচয় দেন। এই পরিচয়কে বর্ম করে ওই এলাকায় তিনি রাম রাজত্ব কায়েম করেছেন। আব্দুল মালেক সুদের বিষয়টি বার বার পাশ কাটিয়ে বলেন, তিনি তিনটি ফার্মের মালিক। তার তিন ভাই বিদেশ থাকে। এভাবেই তিনি স্বচ্ছল হয়েছেন। তিনি বড় বড় নেতা ও সরকারী কর্মকর্তার সাথে তার সম্পর্ক আছে বলে উল্লেখ করেন।রামলোহ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণ দেব পেনশনে যাওয়ার পর জরুরী প্রয়োজনে ২ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। পরে কিস্তির টাকা দিতে গিয়ে পেনশনের টাকায় কেনা সম্পত্তিসহ সর্বস্ব শেষ করেন। ২৫ লাখ টাকা দিয়ে শেষ হয় তার ঋণের দায়। এই ঋণের টাকার চিন্তায় কৃষ্ণ দেব এর মেয়ে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা উমা রানী দেব স্ট্রোক করে মারা যান।ঋণের টাকার সামান্য অবশিষ্ট থাকায় আব্দুল মালেক জামানত থাকা ফাঁকা চেকে বড় অংকের টাকা বসিয়ে এনআই অ্যাক্টে মামলা করেছেন রামলোহ গ্রামের ব্যাংকার সফিকুর রহমান, শের উদ্দিন ও মজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে।সফিকুর রহমান জানান, আব্দুল মালেকের কাছ থেকে ঋণ নিতে হলে ফাকা চেকে দস্তখত দিয়ে জামানত দিতে হয়। কিস্তির পরিমাণ হয় লাখে মাসে ১৫ হাজার থেখে ২০ হাজার টাকা। কিস্তি না দিতে পারলে সেই কিস্তি মূলধনে যুক্ত হয়ে ওই টাকারও সুদ দিতে হয়। আবার অনেক সময় আব্দুল মালেক কিস্তি দিতে নতুন করে ঋন আনতে পরামর্শ দেন তার স্ত্রীর বড় ভাই রাশেদের কাছে যেতে। এভাবেই সুদের চক্রে পড়ে যায় সাধারন মানুষ। এই চক্রের সাথে আরও কিছু লোক জড়িত। আর কিস্তির টাকা যদি সামান্য বাকী থাকে তাহলে ১০ হাজার টাকার স্থলে ফাকা চেকে ৩ লাখ টাকা লিখে মামলা দায়ের করে সে।বনগাঁও গ্রামের জামাল মিয়া নামে এক ব্যাক্তি ঋণ নিয়ে সিএনজি-অটোরিক্সা বিক্রি করে টাকা পরিশোধের পরও আরও টাকা দিতে হবে বলে চাপ দিলে এলাকা ছাড়া হয় সে। তার স্ত্রী বাড়ীতে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। ৫ম শ্রেণী পড়–য়া ছেলে রায়হানকে পড়া লেখা ছাড়িয়েছেন। ৯ম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত মেয়ে তাহমিনা টাকার অভাবে স্কুলে যেতে পারছে না। প্রতিদিনই কান্না কাটি করছে তাহমিনা। সে জানায় বাড়ী বিক্রি করে ঋণ থেকে মুক্তি পেতে  তার বাবা-মা চেষ্টা করছেন।আব্দুল মালেকের সহযোগী ও তার স্ত্রীর বড় ভাই রাশেদ এর সাথে রয়েছেন আরও কয়েকজন সুদের ব্যবসায়ী। ফিরুজ মিয়ার নিকট থেক ৯ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে সিএনজি-অটোরিক্সা বিক্রি করে ৩০ হাজার টাকা দেয়ার পরও বনগাঁও গ্রামের রুহেল মিয়াকে  টাকার জন্য আক্রমন করে ফিরুজ মিয়া। বাড়ী ঘেরাও করে রুহেলের স্ত্রী ও শিশু সন্তানকে উঠিয়ে নিতে চাইলে স্থানীয় লোকজন তাদেরকে রক্ষা করেন। তবে প্রাণ ভয়ে রুহেলের পিতা সাধন মিয়া, মা দুদু বিবি ও স্ত্রী রতœা আক্তারসহ শিশু সন্তানকে নিয়ে বাড়ী ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন তিনি।

গজনাইপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের গোলাপ জানান, আব্দুল মালেকের সুদের ব্যবসার কথা তিনি জানেন। মানুষ বিপদে পড়লে তার কাছে যায়। তবে পরিশোধের সময় ঝামেলা হলে তার কাছে আসে। এ ব্যাপারে কয়েকটি সালিশ বিচারও করেছেন তিনি। এই সুদের ব্যবসাকে নিন্দিনীয় কাজ হিসাবে উল্লেখ করেন তিনি।হবিগঞ্জের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান জানান, দিনারপুর এলাকায় এ ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়টি তাদের জানা নেই। এ ব্যাপারে কোন অভিযোগও আসেনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরও জানান, সমাজে এধরনের অনৈতিক কাজ বন্ধ করতে কমিউিনিটি পুলিশিংকে কাজে লাগানো হবে।আব্দুল মালেককে স্থানীয়রা বলেন টাকার কারবারি। কেউ ঋণ নিয়ে কিস্তি দিতে না পারলে শুরু  হয় আব্দুল মালেকের নির্যাতন।  রাস্তাঘাটে পেলেই তাড়া করেন টাকার জন্য।  তখন বাধ্য হয়ে জমি-জমা ও গাড়ী বাড়ী বিক্রি করে পরিশোধ করেন ঋণের টাকা।ঐতিহ্যবাহী দিনারপুর পরগনার রামলোহ ও বনগাও গ্রামসহ আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রায় ৭০টি পরিবার সর্বশান্ত হয়েছে তার উচ্চহারে সুদের খপ্পরে পরে। লেখাপড়া না জানা ও স্বল্প শিক্ষিত মানুষেরা যখন বিপদে পড়ে তুখন বুঝতে না পেরেই গ্রহন করে এই ঋণ। আর কয়েক কোটি টাকা সুদে লগ্নি করে নিজের আধিপত্য দেখান আব্দুল মালেক।হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক সফিউল আলম জানান, সুদের ব্যবসা ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ। সরকারীভাবেও  বেআইনী। দিনারপুরে ব্যাক্তি উদ্যোগে উচ্চ সুদের যে সুদের ব্যবসা করা হচ্ছে তা তাদের জানা নেই। তবে পুলিশ অথবা জেলা প্রশাসনকে কেউ এ ব্যাপারে অভিযোগ করলে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম-পরিচালক ফজলুর রহমান চৌধুরী জানান, ব্যাক্তি পর্যায়ে সুদের ব্যবসার কোন সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমোদন নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মাইক্রোক্রেডিট পরিচালনা করা যাবে। তবে তার সুদ হবে সুনির্দিষ্ট। গ্রামে যারা সুদের ব্যবসা করেন এটি এক ধরনের মহাজনী ব্যবস্থা।ব্র্যাক হবিগঞ্জে ব্যবস্থাপক মো. ফিরুজ ভূইয়া জানান, ক্ষুদ্র ঋণ পরিচালনার একমাত্র অধিকারী হল এনজিওদের। তবে যাদের অনুমতি আছে তারাই শুধু তা করতে পারবে। ব্যাক্তিগতভাবে যারা সুদের ব্যবসা করেন তারা বেআইনীভাবে তা করেন।হবিগঞ্জ উন্নয়ন সংস্থার প্রদান নির্বাহী কর্মকবর্তা, মোহাম্মদ শাহিন জানান, ব্যাক্তিগত পর্যায়ে সুদের ব্যবসা বেআইনী। এ ব্যাপারে গেজেট আছে এবং সংসদে আইন আছে। হবিগঞ্জে ব্র্যাক ও আশার পাশাপাশি স্থানীয় ২/১টি এনজিওর মাইক্রোকেডিট পরিচালনার অনুমিত আছে। আর মাইক্রো কেটিড পরিচালনার জন্য মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আছে। তারাই ব্যাক্তিগত পর্যায়ে যারা অবৈধভাবে সুদের ব্যসা করছে তাদেরকে নিয়ন্ত্রন করবে।তিনি আরও জানান, হবিগঞ্জে উচ্চ সুদের মাধ্যমে মহাজনী সুদের ব্যবসায় অনেক লোক ক্ষতিগ্রস্থ ও সর্বশান্ত হয়েছেন।

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়াার করুন

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.