সংবাদ শিরোনাম
গোয়াইনঘাটে পূর্ব শত্রুতার জেরে বৃদ্ধকে কুপিয়ে হত্যা: গ্রেপ্তার ১  » «   জগন্নাথপুরে ত্রাণের পিছে ছুটছে মানুষ  » «   ওসমানীনগরে প্রশাসনের তালিকায় অবশেষে বাড়লো বন্যাক্রান্তের সংখ্যা  » «   মানবাধিকার ও অনুসন্ধান কল্যাণ সোসাইটির বানবাসী মানুষের মাঝে রান্না করা খাবার বিতরণ  » «   বানবাসিদের তোপের মুখে এমপি মানিক: সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান চেয়ারম্যানের মধ্যে সংঘর্ষ   » «   চুনারুঘাটে কলেজ ছাত্রীকে উত্যক্ত করার প্রতিবাদ করায় ছাত্রীর মামা কে কুপিয়েছে দুর্বৃত্তরা  » «   জৈন্তাপুরে মা -ছেলের লাশ উদ্ধার  » «   তাহিরপুরে ত্রাণের জন্য বানভাসিদের হাহাকার পানি কমলেও বাড়ছে দুর্ভোগ  » «   বালাগঞ্জে কুশিয়ারা নদী বিপদসীমার ওপরে, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন  » «   সিলেটে বন্যা দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  » «   হেলিকপ্টার থেকে ছুঁড়ে দেয়া ত্রাণ সামগ্রী নিতে গিয়ে আহত ৬  » «   জৈন্তাপুরে ২০ জনকে উদ্ধার করলো বিজিবি টহল দল ও বন্যার্থদের মাজে খাদ্য বিতরন  » «   জৈন্তাপুরে বন্যার্থদের পাশে জৈন্তাপুর মডেল থানা  » «   সিলেট বিভাগের ৮০ শতাংশ এলাকা এখন পানির নিচে  » «   ৯ বছর পর আজ চুনারুঘাট উপজেলা আওয়ামীলীগের কাউন্সিল কে হচ্ছেন নেতা  » «  

অপার সম্ভাবনাময় “সাউথ ইস্ট টাংগুয়া “

লেখকঃ সমীরণ তালুকদারআমার জন্ম টাংগুয়ার হাওরের দক্ষিণ পূর্ব কোনে, এখানেই কেটেছে আমার শৈশব,
শৈশবে আমি গরু চড়িয়েছি এই টাংগুয়ার বুকে,  কামলাদের সাথে নিয়ে জ্বালানি
সংগ্রহ করার জন্য কেটেছি বল্লুয়া বনতুলসী। রান্না ঘরের চাউনী দেওয়ার জন্য
কেটে এনেছি বিন্না বা ছন, এই জ্বালানি বা ছন সংগ্রহের জন্য আমাদের বেশি
দূর যেতে হতনা, আমাদের বাড়ি থেকে দুই আড়াই কিলোমিটার দূরে রাজনগরের ছড়ি
আর বেশি হলে খালেক চাচার ভিটা পর্যন্ত।  পূর্ব পাড়ে বড়জোর কারার বিলের
আশপাশ, এই সীমার মধ্যেই আমাদের কয়েকটি গ্রামের প্রয়োজনীয় সব কিছুই জোগাড়
হয়ে যেতো,  এ কারণে এই কয়েকটি গ্রামের মানুষদের গহীন টাংগুয়ায় প্রবেশের
কোন  প্রয়োজনীয়তা ছিল না। এবার আসি মাছের কথায়, বিস্তারিত বর্ণনায় না
গিয়ে বলতে পারি মাছের জন্যেও  আমাদের এই সীমার বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল
না। কিন্তু আজ আমরা কি দেখতে পাচ্ছি? সরকার এই হাওরের দায়িত্ব নেওয়ার পর
থেকে সব কিছুই যেনো উধাও হতে হতে শেষ সীমানায় এসে দাড়িয়েছে। আমার ভাবনার
আকাশে সব সময়ই এই চিন্তাটাই ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়,  কখনও হতাশ হই,  এর
করুন অবস্থা দেখে, মনে মনে ভাবি – না,   এই টাংগুয়া আর ফিরে যাবেনা তার
পূর্বের রূপে, এটি উজাড় হতে হতে এক সময় বিরান ভূমিতে পরিনত হবে। হেতায় আর
থাকবেনা কোন মাছ, থাকবেনা পাখি কেবলই দূর্বা ঘাসের সবুজাভ আবরণ ছাড়া
অবশিষ্ট থাকবেনা কিছুই। হাওরের এই করুণ পরিনতি আমাকে ব্যথিত করে, আবার
যখন শুনি আমাদের হাওর দরদী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন হাওর আর হাওরপারের
মানুষের জন্য উনার হৃদয়ে আছে সফট কর্নার, হাওর তথা  হাওরের পরিবেশ
উন্নয়নে তিনি মুক্ত হস্ত তখন ভাবনা আসে, তবে  কেন আমাদের হাওরের এই করুণ
অবস্থা? আবার দেখি সরকারি ভাবে হাওরে ছাড়া হয় মাছের পোনা, গাছ লাগাতে  বন
ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয় স্বয়ং নিজে এসে উপস্থিত হন,  তখন আমি,
এই আমি আবারও আশায় বুক বাধি, স্বপ্ন দেখি একটা সুস্থ হাওরের, গাছ,
মাছ,হাওরের জীব বৈচিত্রে ভরপুর আর পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত বন -মাছ আর
পাখিদের এক স্বর্গ রাজ্য। আমি স্বপ্ন দেখি, আমাদের গ্রাম থেকে উত্তর দিকে
যে মরা নদীটি এঁকেবেঁকে যেতে যেতে খালেক চাচার ভিটা পার হয়ে মিশেছে
রাজার দ্বাইরের সাথে এই নদীর পশ্চিম পাড়ে একটা করচের বাগান আছে বাগানটি
প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ যা ঘন্নিয়ার বিলের পাড় থেকে শুরু হয়ে গাইন
কাকুর ছড়ি পার হয়ে কিছু দূর গিয়েই ক্রমে ক্রমে পাতলা হতে হতে আমাদের
গোপের ছড়ির আগেই  শেষ হয়ে গেছে। এই শেষ হওয়ার জায়গা থেকে শুরু করে
একেবারে পাটিচোরার ভিটা পার হয়ে রাজার দ্বাইরের মুখ পর্যন্ত লাগানো হবে
গাছ, আর নদীর পূর্ব পাড়ে ঘুরতি গাং থেকে শুরু করে আবারও রাজার দ্বাইরের
মুখ পর্যন্ত। এই দুই পাড়ে হিজল – করচ –  বরুণ আর ব্যাস গাছ এমন ভাবে
লাগানো হবে,  যেন গাছগুলো বড় হয়েও একটির সাথে আরেকটি লেগে গিয়ে গাছের
তলাটা অন্ধকার করে না তুলে, দুই গাছের মধ্যে এমনই দূরত্ব রাখতে হবে যাতে
এই ফাঁকা জায়গায় যথেষ্ট পরিমাণ বল্লুয়া, বনতুলসী, নল, খাগড়া, গোঁজার
কাটা আরও শত শত প্রজাতির উদ্ভিদ অনায়াসে বেড়ে উঠতে পারে। এতে কি হবে? এতে
দেখা যাবে বল্লুয়া গাছগুলো করচ গাছকে আশ্রয় করে অনেক উপরে উঠে গেছে,
একেকটা  গাছ, একেকটা পিরামিডের আকার ধারণ করবে, বিভিন্ন প্রজাতির পাখিরা
হেতায় বাঁধবে  তার বাসা, হরেক রকমের গিরগিটি পাবে তার আশ্রয়, গড়ে উঠবে এক
অনন্য জীব বৈচিত্রের অভয়ারণ্য, বর্ষায় মাছেরা পাবে তার নিরাপদ বিচরণ
ক্ষেত্র আর পর্যটকেরা উপভোগ করবে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। এই সৌন্দর্য
উপভোগ করতে হলে শুধু গাছ লাগিয়ে বসে থাকলেই চলবেনা, গাছ লাগানোর পর,
ব্যবস্থা রাখতে হবে জোরদার তদারকির, আর এজন্য তেমন আহামরি কোন অর্থের
প্রয়োজন নাই। আমাদের গ্রাম থেকে রাজার দ্বাইরের মুখ পর্যন্ত প্রায় পাচ
কিলোমিটার নদীর দুইটি পাড় মোট দশ কিলোমিটার বন রক্ষনাবেক্ষনের জন্য দুইজন
পইরল বা পাহারাদারই যথেষ্ট, তাদের দুজনের মাসিক বেতন হতে পারে সাত হাজার
করে চৌদ্দ হাজার টাকা আর তাদেরকে দিতে হবে একটি করে স্মার্ট ফোন  সাথে
মাসে পাঁচশত করে   ইন্টারনেট ডাটার খরচ, যাতে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত বিশ্বের
যেকোন প্রান্তে বসে তাদের অবস্থান আর হাওরের চিত্র দেখে নেওয়া যায়, আর
থাকবে একটি কমিটি বা সংগঠন যার সাথে যুক্ত থাকব আমরা যারা হাওরকে
ভালোবাসি, সময় পেলেই ছুটে যাব হাওরে, সেখানে গিয়ে এক নজর দেখে নিব আমাদের
স্বপ্নের এই বনভূমিকে।   এতে মাসিক খরচ আসবে ১৫০০০/ টাকা,  আর সারা বছর
জুড়ে পাহারার প্রয়োজন নাই। যদি বছরের ছয়মাস এই ব্যবস্থা নেওয়া যায় তাহলে
খরচ আসে ৯০০০০/ বা এক লক্ষ টাকা, তিন বছরে তিন লক্ষ টাকা। এই তিন বছর পর
এখানে যে অরন্যের সৃষ্টি হবে তা বর্ণনাতীত, এখানে সহজেই মানুষ হারিয়ে
যেতে পারবে, এই অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছিল যখন মরহুম, চেয়ারম্যান জয়নাল
আবেদিন সাহেব  টাংগুয়ার লিজ নিয়েছিলেন, তখন এই বর্নিত জায়গায় গুলোতে
দিনের বেলাও কেউ একা যেতে সাহস পায়নি। অপরদিকে এই অঞ্চলকে তিনটি ভাগে ভাগ
করে প্রতি বছর একেকটি অংশ আসপাশের গ্রামের মানুষেরা কেটে নিতে পারবে
তাদের জ্বালানির জন্য, এতে বনের কোন ক্ষতি হবেনা, কারণ যে অংশটুকু এবার
কাটা হবে তা পরবর্তী দুই বছরে আবারও পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাবে,  এলাকার
মানুষ পাবে সাশ্রয়ী জ্বালানী । যারা এর সুবিধা ভোগ করবে পরবর্তীতে তারাই
এই বনের দেখাশুনার দায়িত্ব গ্রহণ করবে এতে করে পাহারা বাবত আর ব্যয় হবে
না। আরো আছে আমরা যদি পারি ঘুরতি গাংনের উত্তর হতে রাজার দ্বাইরের মুখ
পর্যন্ত নদীটি খনন করে এই মরা নদীকে রাজার দ্বাইরের সাথে যুক্ত করে দেব,
যাতে ফাল্গুন চৈত্র মাসের এই নদীতে সাত আট ফুট পানি থাকে তবে এই নদীতে
আমরা পাব কয়েকটি ডহর যা হবে মাছের অভয়ারণ্য যেথায় মনের আনন্দে নিরাপদে
নির্ভয়ে বেড়ে উঠবে শত -সহস্রাধিক প্রজাতির দেশীয় মাছ। কার্তিক মাসে নদীর
দুই পাড় ভেসে উঠলেই সেথায় আমরা ছাড়তে পারি মাছের পোনা যা এখানে ছয় মাস
বেড়ে উঠে বর্ষায় ছড়িয়ে যাবে সমগ্র ভাটির রাজ্যে আর আসপাশের বিল গুলো ভরে
উঠবে নানান প্রজাতির  মাছে মাছে যার ফল আমরা পাবো এক বছর পর। এই কাজে যদি
আমরা সফল হতে পারি তবে এই অঞ্চল হবে একটা মডেল।  হবে পর্যটকদের একটা
আকর্ষণীয় স্থান, নানান জায়গা থেকে আসবে পর্যটক, বসবে এসে ঘুরতি গাংগের
পাড়ে, আসবে বাউল, দুতারায় তুলবে সুর, “চাচা গো, চাচা গো, আমরা বাড়িত
আইলায় তুমি খাইয়া গেলায় না, দেখবে কত শোল -গজারের খেলা। নিবিড় শান্ত
হাওরের নিস্তব্ধতা হঠাৎ ভেঙ্গে দিয়ে উড়ে যাবে বালিহাস, নদীর পাড় বেয়ে টিক
টিক শব্দে সাদা কালো লেজ নাড়িয়ে ডাহুক খুজবে তার খাবার, দলে দলে ঘুরে
বেড়াবে বৈদরের দল, দিনের বেলায় গাছে আশ্রয় নিবে হাজারে “অককিয়া, এক
প্রজাতির বক, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদের পর  এক গাছ থেকে আরেক গাছে উড়ে
গিয়ে বসবে এরা, বিকেল বেলা উড়ে যাবে খাবারের খুজে দূরে অনেক দূরে, সকালে
আবারও আসবে ফিরে। কার্তিকের শেষে দুই পাড় জেগে উঠলেই এই নদী দিয়ে ইঞ্জিন
চালিত সকল যানবাহন চলাচল থাকবে বন্ধ, এতে মাছেরা পাবে আনন্দ আর স্বস্তি।
বেড়ে উঠবে আপন মনে। যারা আরাম আয়েসে দেখতে চাইবে এই “সাউথ ইস্ট টাংগুয়া
লেক, তারা আমাদের গ্রামের উত্তরের ডোয়ারের ঘাট হতে উঠবে হাতে বাওয়া ছোট
ছইয়া নৌকায়, নৌকা আঁকাবাঁকা নদী ধরে এগিয়ে যাবে উত্তর দিকে, জায়গায়
জায়গায় নেমে তুলবে ছবি, পাখিদের বিরক্ত না করে, যেতে যেতে চলে যাবে একদম
রাজার দ্বাইরে, পূর্ব দিকে গেলেই পাবে “ওয়াচ টাওয়ার ” আর পশ্চিমে রূপাভূই
বিলের মুখ পর্যন্ত। অতিথি বলবেন সামনে যাও, না আর সামনে যাওয়া যাবেনা,
এটা মাদার ফিসারির মূল কেন্দ্র, এখানে প্রবেশ নিষেধ। আবার ফিরে আসবে,
মাঝে মাঝে তীরে উঠে দেখবে কত শত প্রজাতির পাখি, চারিদিকে নয়নাভিরাম
দৃশ্য, যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ, নিস্তব্ধ হাওরে শুধু পাখি আর
মাছেদের কলরব। হাওর পাড়ের গ্রাম গুলোতে থাকবে ছোট্ট ছোট্ট কটেজ, কটেজে
এসে খেতে পাবে, শালি ধানের চালের ভাতের সাথে হাওরের লাল টুকটুকে মরিচ
দিয়ে টাকি মাছের ভর্তা, গোঁজার কাটার মরা ডাল দিয়ে জ্বাল দেওয়া হাওরের
দেশী গাভীর ঘন লাল দুধ আর হাসা বা আছিম ধানের চাল আর দুধ দিয়ে তৈরি
“মিষ্টান্ন, আহ! কি অপূর্ব। আমি আজও স্বপ্ন দেখি, আমি – আমার এলাকাবাসীর
তথা হাওর প্রেমিক বন্ধুদের  এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কেউ না কেউ একদিন এগিয়ে
আসবে, তবে বড় দেরী হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানতে পারলাম,
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয়, মুজিব বর্ষ উপলক্ষে দশ লক্ষ গাছ
লাগাবেন এই হাওরে, আমি সচিব মহোদয় কে বিনীত অনুরোধ জানাব, আমার বর্নিত এই
এলাকায় গাছ লাগিয়ে রক্ষনাবেক্ষনের ব্যবস্থা নিলে আমি সহ আরো হাজারো
পরিবেশ প্রেমী আপনার সহায়তায়  সব সময় নিজেদের বিলিয়ে দিতে সদা প্রস্তুত
থাকব। আমি মনে প্রাণে এও বিশ্বাস করি যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে  এখন আপনিই
পারেন, এই মরু রূপী হাওরের এই অংশকে তরু রূপী স্বর্গে রুপায়িত করে তরু
ছায়ায় ভরে দিয়ে গাছ -মাছ -পাখিদের  একটা অভয়ারণ্য গড়ে তুলে এই এলাকার তথা
পরিবেশ এলাকার মানুষের জীবন মান  উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করতে।

লেখকঃ সমীরণ তালুকদার
শিক্ষক, ঘুঙ্গাদিয়া-বড়দেশ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বিয়ানীবাজার, সিলেট।
মোবাইলঃ ০১৭৯৪-৫৬৫০৯৯

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়াার করুন

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.