সংবাদ শিরোনাম
শাল্লার বাহারা ইউপি চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ কর্তৃক এক মহিলা দর্জিকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা, অভিযোগ দায়ের  » «   ঢাকা-সিলেট মিতালি পরিবহনের বাসের ধাক্কায় অটোরিকশার চালক সহ দুইজন নিহত  » «   বিশ্বম্ভরপুরে কালভার্ট ভেঙে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন  » «   ওসমানীনগর উপজেলা প্রশাসনের মসজিদ ঘিরে ধ্রুমজাল!  » «   ঢাকা- সিলেট মহা সড়কের দক্ষিণ কুর্শা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১, পরিবারে চলছে শোকের মাতম  » «   জৈন্তাপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত এক, আহত ৫  » «   মদিনা মার্কেটস্থ কালিবাড়ি রোডে ট্রাকচাপায় ব্যবসায়ী ফয়জুর নিহত  » «   খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে-সিলেটে খাদ্যমন্ত্রী  » «   আশারকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান আইয়ূব খান কর্তৃক উপকারভোগীদের ২শতাধিক ড্রামের টাকা আত্মসাত,বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দায়ের  » «   গোয়াইনঘাটে পাহাড়ী ঢল ও ভারী বর্ষণে নিম্মাঞ্চল প্লাবিত  » «   সুনামগঞ্জ সদর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় পাহাড়ি ঢলের পানিতে ১৬ শত একর পাকা ধান ও বাড়ি-ঘর ভেসে গেছে  » «   সাংবা‌দিক বাবরের পিতার মৃত্যুতে অনুসন্ধান কল্যাণ সোসাইটি সিলেট এর শোক প্রকাশ  » «   জৈন্তাপুরে নৌকা ডুবিতে একি পরিবারের ৫ জন উদ্ধার ১ জন নিখোঁজ  » «   সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলা সীমান্ত এখন গরু চোরাচালানের স্বর্গরাজ্য  » «   নবীগঞ্জে নিহত জাহান খুনের ৮ দিন অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত কাউকে ধরতে পড়েনি পুলিশ!  » «  

শতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গ -৪র্থ পর্ব

মোঃ আব্দুল মালিক::রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ ৭েম ১৮৬১ – ৭ আগস্ট ১৯৪১) “রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি, রবীন্দ্রনাথ মহাকবি-কিন্তু স্মরণীয় যে, তিনি শুধু একজন বিশ্বকবি বা একজন মহা কবিই নন, তিনি একজন শিক্ষক, একজন মহোত্তম শিক্ষক এবং তিনি গুরুদেব। আরো বিস্ময় সমগ্র পৃথিবীতে রবীন্দ্রনাথই একটি বিরল দৃষ্টান্ত যে, তিনি শুধু কাব্য সাহিত্যের মাধ্যমেই সমগ্র জাতির মর্মমূলে আধুনিক চিন্তা-চেতনা ও মনন জাগরণের আলোক সম্পাত করেন নি, তিনি নিজে একটি বিদ্যালয় এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে জাতির শিক্ষাদানের কার্যভারও নিজের হাতেই গ্রহণ করেছিলেন।” (শান্তি নিকেতন ও বিশ্বভারতী, রবীন্দ্র রচনাবলী, খন্ড-১৩, পৃ:৪৯০।)

যে রবীন্দ্রনাথ নিজেই একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেই রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন বলে সাবেক পূর্ববঙ্গ, পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশে ব্যাপক প্রচার রয়েছে। এ অঞ্চলে আরো কয়েকটি বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে বিতর্ক আছে। যেমন-কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন নোবেল পুরস্কারের যোগ্য। কিন্তু বৃটিশ বিরোধিতার কারণে তাঁকে নোবেল পুরস্কার না দিয়ে বৃটিশ তোষণ নীতির কারণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সেই নোবেল দেয়া হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছেন, মুসলিম বিদ্বেষী ছিলেন ইত্যাদি। ইতিহাসের স্বার্থে ইতিহাসের আলোকে এগুলো আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।

প্রথমেই নোবেল প্রসঙ্গঃ নোবেল পুরস্কারের মনোনয়ন দিয়ে থাকে সুইচ একাডেমির একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি। সুইডেন একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। তার উপর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা বৃটিশ সরকার রাখে না। যদি রাখতো তাহলে প্রতি বৎসর কোন না কোন বৃটিশ নাগরিক নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হতো। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত হন ১৯১৩ সালে। সেই সময় কাজী নজরুল ইসলামের বয়স ছিল মাত্র ১৩ বৎসর। তখন তাঁর সাহিত্যিক জীবনের শুরুই হয় নি। কাজী নজরুল ইসলামের জীবনকাল হচ্ছে ২৫ মে ১৮৯৯Ñ২৯ আগস্ট ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ। এই প্রচারণা কতটা অপপ্রচার ছিল তা এখান থেকেই সুস্পষ্ট।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গ ঃ বলা হয়ে থাকে ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বিরোধী একটি জনসভা হয়েছে এবং তাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সভাপতিত্ব করেন। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যে কথা। হ্যাঁ, ঐ দিন সেখানে একটি জনসভা হয়েছে, কিন্তু তাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সভাপতিত্ব করেন নি। এমন কী সেদিন তিনি কলকাতাতেই ছিলেন না। তিনি ছিলেন শিলাইদহে। তার চেয়েও বড়ো কথা সেদিন তাঁর থাকার কথা ছিলো লন্ডনে। ১৯ মার্চ কবির ইউরোপ যাওয়ার তারিখ নির্ধারিত ছিলো এবং কলকাতা বন্দর থেকে ভোরে তিনি জাহাজে উঠবেন। কবির বাক্স-পেটরাও কিছু কিছু ক্যাবিনে উঠে গেছে। কিন্তু কবি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ডাক্তার তাঁকে বিলেত যেতে নিষেধ করেন। এ সম্পর্কে তাঁর সহযাত্রী ডাক্তার দ্বিজেন্দ্রনাথ মৈত্র লিখেছেন, ‘১৯শে মার্চ ভোরে কল্কেতা থেকে জাহাজ ছাড়বে। আমি জাহাজে উঠলাম; কবির বাক্স-পেটরাও কিছু কিছু আমাদের ক্যাবিনে উঠল; সময় উত্তীর্ণ হয়ে যায়! কিন্তু কবি কই ? বহুলোক তাঁকে বিদায়ের নমস্কার জানাতে ফুল ও মালা নিয়ে উপস্থিত; তাঁদের মুখ বিষন্ন হ’ল। খবর এলো যে, কবি অসুস্থ; আসতে পারবেন না। ঐ [চৈত্রমাসের] গরমে উপর্যুপরি নিমন্ত্রণ-অভ্যর্থনাদির আদর-অত্যাচারে রওনা হবার দিন ভোরে প্রস্তুত হ’তে গিয়ে, মাথা ঘুরে তিনি প্রায় পড়ে যান। ডাক্তাররা বললেন, তাঁর এ-যাত্রা কোনমতেই সমীচীন হ’তে পারে না। রইলেন তিনি, আর গোটা ক্যাবিনে একা রাজত্ব ক’রে তাঁর বাক্স-পেটরা নিয়ে চল্লুম আমি একলা।’ (রবীন্দ্র সংস্পর্শে জয়ন্তী-উৎসর্গ, পৃ. ১৯৩; রবীন্দ্রজীবনী, ১৪১৬, প্রভাতকুমার মুখ্যোপাধ্যায়, পৃ. ৩৪২।)

এখানে একথা স্পষ্ট যে, তাঁর বিলেত যাওয়া পূর্ব নির্ধারিত ছিলো, তাই গড়ের মাঠের সভায় যাওয়ার তাঁর কোনো পরিকল্পনা ছিলো না। এরপরের কথা হলো- তিনি তো শেষ পর্যন্ত বিলেত যাননি। তবে তিনি কলকাতায়ও ছিলেন না। চলে গিয়েছিলেন শিলাইদহ। এ সম্পর্কে প্রমাণ হলো ২৫ মার্চ ১৯১২ তারিখে কাদম্বিনী দেবীকে লেখা কবির চিঠি। চিঠি লিখেছিলেন শিলাইদহ থেকে। তিনি লিখেছেন: ‘… এখনো মাথার পরিশ্রম নিষেধ। শিলাইদহে নির্জনে পালাইয়া আসিয়াছি।’ (চিঠিপত্র, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৫৩) সুতরাং তিনি শিলাইদহে গিয়েছিলেন এবং সেখানে কয়েক দিন বাস করেছিলেন। কয়েকদিন বাস করেছিলেন, তার প্রমাণ হলো সেখানে বসে তিনি ২৮ মার্চ থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত আঠারোটি কবিতা ও গান লিখেছেন এবং তাতে তারিখ এবং স্থান হিসেবে শিলাইদহের নাম উল্লেখ রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ প্রতিটি রচনার শেষে তারিখ এবং স্থানের নাম লিখতেন! এ সময়ে লেখা তাঁর ‘ভাসান’ কবিতার উল্লেখ করা যায়। এই হলো গড়ের মাঠের জনসভার বানোয়াট কাহিনী।

১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিমন্ত্রিত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপতি হয় ১৯২১ সালে। মাত্র পাঁচ বছর পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকার নবাব খাজা নাজিমুদ্দিন ও জনগণের আমন্ত্রণে ঢাকা আসেন। রবীন্দ্রনাথের জমিদারীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয় নাই বা ঐ সময় রবীন্দ্র বলয়ের কেউ ঢাকার দায়িত্বে ছিলেন না। তখন খাজা নাজিমুদ্দিন, সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, নওয়াব খাজা মোহাম্মদ ইউসুফ জান, নওয়াব খাজা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ, নওয়াব খাজা মোহাম্মদ আফজল, শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক প্রমুখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোর্টের (বর্তমান সিনেট) প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন । ১৯২৪-২৫, ২৭ ও ১৯৩৫-৩৬ সালে শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী, নবাব মোশাররফ হোসেন এবং এম.আজিজুল হক শিক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। সাধারণ বুদ্ধিতেই বোঝা যায়, যিনি বিরোধিতা করবেন, তাঁকে নিশ্চয়ই মাত্র পাঁচ বছর পর নিমন্ত্রণ করা হবে না। কারণ মানুষ এতো তাড়াতাড়ি বিরোধীপক্ষকে ভুলে যেতে পারে না। অথচ সে সময় যে ঘটনা ঘটেছিলো, তা হলো- ঢাকার নবাব খাজা নাজিমুদ্দিনসহ জনগণ চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ তাঁদের আতিথেয়তা গ্রহণ করবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কতর্ৃপক্ষ চেয়েছিলেন কবি তাদের আতিথেয়তা গ্রহণ করবেন। রবীন্দ্রনাথ এমতাবস্থায় নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে সে পরিস্থিতির সমাধান করেন। তিনি ৬-১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নবাবের আতিথেয়তা নিয়েছিলেন, তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কতর্ৃপক্ষের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি হলেই কবিকে সংবর্ধনা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১০ ফেব্রুয়ারি বিকালে মুসলিম হলের ছাত্র শিক্ষকরা তাঁকে সংবর্ধনা দেন এবং ছাত্ররা একটি অভিনন্দনপত্র পাঠ করেন। তাঁকে মুসলিম হল ইউনিয়নের আজীবন সদস্যপদও প্রদান করা হয়। ঐদিন রাতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন বিধায় বাকি দুই হলের সংবর্ধনা সভায় যেতে পারেন নি।

বাঙালি মুসলমান সমাজে মুক্ত বুদ্ধিচর্চার সূত্রপাত ঘটে মুসলিম হল থেকে। মুসলিম হল ইউনিয়নের কক্ষে ১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সভাপতিত্বে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ নামে একটি প্রগতিশীল সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়। উক্ত সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল হোসেন। অন্যতম সদস্য ছিলেন কবি আব্দুল কাদির, কাজী আব্দুল ওদুদ, কাজী মোতাহের হোসেন চৌধুরী, কাজী আনোয়ারুল কাদির, সৈয়দ শামসুল হুদা, আবুল ফজল প্রমুখ। এদের মুখপত্র ছিল ‘শিখা’। এদেরকে  ‘শিখা গোষ্ঠী’ নামেও অভিহিত করা হতো। ‘শিখা’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য কর্ম নিয়ে মুসলিম লেখকগণ প্রবন্ধ রচনা করেছেন। ‘রবীন্দ্র কাব্যের স্বরূপ’ শিরোনামে এ.এম তাহের উদ্দিনের প্রবন্ধ মুসলিম সাহিত্য সমাজের ১৯২৬ সালের অধিবেশনে পঠিত হয় এবং ‘শিখা’র ২য় সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। ১৯৩১ সালে শিখা’র পঞ্চম সংখ্যায় প্রকাশিত হয় মোতাহের হোসেন চৌধুরী রচিত ‘রবীন্দ্রনাথ ও বৈরাগ্য বিলাস’ নামক প্রবন্ধটি। ১৯৩৩ সালে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের বার্ষিকীতে কবিতা পাঠাতে অনুরোধ করলে রবীন্দ্রনাথ ‘উদ্বোধন’ নামে একটি কবিতা পাঠান এবং তা ঐ সংখ্যায় ছাপা হয়। এভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে প্রকাশিত বার্ষিকীতে রবীন্দ্রনাথের একাধিক কবিতা ছাপা হয়। তিনি যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করতেন তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাজ্ঞ ছাত্র শিক্ষকরা তাঁকে এভাবে মূল্যায়ন করতেন না। উল্লেখ্য ১৯২৮ সালে তাঁকে আরেকবার ঢাকায় আনার উদ্যোগ নেয়া হয় কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত অসুবিধা থাকায় তিনি আসতে পারেন নি। তারপর ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি লিট উপাধি দেয়। বিরোধিতা করলে এটাও হতো না। কারণ এতো তাড়াতাড়ি ক্ষত শুকানোর কথা নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন যারা তাদের মধ্যে অন্যতম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, রাজনীতিবিদ সুরেন্দ্র নাথ ব্যানার্জী, কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবি ড. রাসবিহারী ঘোষ, ডা. নীল রতন সরকার প্রমুখ। অবশ্য পরে এদের অনেকেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বা স্যাডলার কমিশনের সদস্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পক্ষে কাজ করেছেন।

১৯২০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় আইন সভায় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল’টির সুক্ষ্মতা পরীক্ষার জন্য ‘সিলেক্ট কমিটি’তে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। ঐ সময় নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী ঐ বিলে একটি সংশোধনী প্রস্তাব অন্র্Íভূক্তির দাবি জানান। তখন হিন্দু বুদ্ধিজীবি রাজনীতিবিদদের একাংশ তথা ড. হিরা লাল হারদার, অধ্যাপক হেমচন্দ্র দাশ গুপ্ত, কুমুদিনী কান্ত ব্যানার্জী, অতুল চন্দ্র সেন, প্রমথ নাথ তারা ভূষণ প্রমুখ নওয়াব আলী চৌধুরীর প্রস্তাব সমর্থন করেন। হিন্দু নেতাগণ সংশোধনী প্রস্তাব সমর্থন করায় নওয়াব আলী চৌধুরী তাঁদেরকে ধন্যবাদও জানান’। -চৎড়পববফরহমং ড়ভ ঃযব ওহফরধহ খবমরংষধঃরাব পড়ঁহপরষ, ঋবনৎঁধৎু ১১.১৯২০ ঢ়-৬৭৬.

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেছেন এমন কোন তথ্য বিরোধিরা উপস্থাপন করতে পারেন নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. তৌহিদুল হক বলেছেন,- “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় যে তিন শ্রেণির মানুষ বিরোধিতা করেছিলেন তাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তৃতীয় কাতারে রাখতে চাই। কারণ তিনি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের উচ্চবর্ণের হিন্দু। তাঁর সঙ্গে বিশেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় আর রাজনীতিক সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। শিলাইদহ যাওয়ার আগে তাদের সাথে রবীন্দ্রনাথের একাধিকবার বৈঠক ও আলোচনা হয়েছে। ধারণা করা যায় এই সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আলোচনা করে থাকবেন।” (গুগল উইকিপিডিয়া) ‘আলোচনা করে থাকবেন’ এই ধারনা থেকে তিনি বিরোধিতা করেছেন এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছা কতটুকু যৌক্তিক ?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা শুধু পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরাই করেন নি, বঙ্গের মুসলমানরাও করেছেন। পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের বিরোধিতার কারণ ছিল পূর্ববঙ্গে তখন মাত্র ৯টি কলেজ ছিল, বিদ্যালয়ের সংখ্যাও ছিল নগণ্য। তাই তাদের দাবী ছিল বিশ্ববিদ্যালয় না করে সর্বসাধারনের জন্য আরো স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হউক। আর পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের বিরোধিতার কারণ হলো ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে তাদের লাভ কি ? বরং পূর্ববঙ্গের ছাত্ররা না গেলে সম্পর্কে ছেদ পড়বে। পশ্চিম বঙ্গের হিন্দুরা বিরোধিতা করেছেন তাদের ধারণা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে পূর্ববঙ্গের ছাত্ররা পশ্চিমবঙ্গে যাবে না। ফলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংকট দেখা দিবে, ব্যবসা বানিজ্যে ভাটা পড়বে। অন্যদিকে পূর্ববঙ্গের অনেক হিন্দু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম জগন্নাথ রায় চৌধুরী। তাঁর বিশেষ অবদানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি হলের একটির নামকরণ করা হয় তাঁর নামে ‘জগন্নাথ হল’। পূর্বেকার জগন্নাথ কলেজ বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁরই নামে। অতএব পক্ষে বিপক্ষে অবস্থান ছিল যার যার সুবিধার্থে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন এ অঞ্চলেও অনেক সময় নতুন স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার সময় পার্শ্ববর্তী স্কুল-কলেজ, এলাকার মানুষের বিরোধিতার ভুরিভুরি প্রমাণ রয়েছে।

তাই সঙ্গত ভাবে বলা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেননি।

(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী অবস্থান ও মুসলিম বিদ্বেষ আগামী পর্বে)

তথ্যসূত্র-

১। ইতিহাসের আলোকে আমাদের শিক্ষার ঐতিহ্য ও প্রকৃতি-অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আলমগীর।

২। বৃটিশ আমলে বাংলার মুসলিম শিক্ষা সমস্যা ও প্রসার-মোঃ আব্দুল্লা আল মামুন।

৩। ভারতের মুসলমান ও স্বাধীনতা আন্দোলন-মুহাম্মদ-ইমাম-উল-হক।

৪। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রন্থিত ইতিহাস-ড. রতন লাল চক্রবর্তী।

৫। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন স্মারক-২০১৯।

৬। অসমাপ্ত আত্মজীবনী- শেখ মুজিবুর রহমান।

৭। পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি-বদর উদ্দিন ওমর।

৮। কাছে থেকে দেখা ১৯৭৩-১৯৭৫- মেজর জেনারেল এম খলিলুর রহমান।

৯। ড. নূর-ই-ইসলাম সেলু বাসিত, সাবেক পরিচালক জনসংযোগ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

১০। শিক্ষার মাধ্যম মাতৃভাষা ও রবীন্দ্রনাথ- ড. শফিউদ্দীন আহমদ।

১১। গুগল ও উইকিপিডিয়া।

১২। বণিক বার্তা, ১৫ অক্টোবর ২০২০।

শিক্ষায় রবীন্দ্রনাথ কোনো সংকীর্ণতা বিশ্বাস করতেন না। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সমগ্র বিশ্বের যা ভালো ও মহৎ তা সবই আত্মস্থ করে গ্রহণ করার জন্য রবীন্দ্রনাথ নিজের অভিমত পোষণ করেছেনÑ

“বিদ্যার নদী আমাদের দেশে বৈদিক, পৌরাণিক, বৌদ্ধ, জৈন, প্রধানত এই চারি শাখায় প্রবাহিত। ভারত-চিড়িগঙ্গোত্রীতে ইহার উদ্ভব। কিন্তু, দেশে যে নদী চলিতেছে,  কেবল সেই দেশের জলে সেই নদী পুষ্ট না হইতেও পারে। ভারতের গঙ্গার সঙ্গে তিব্বতের ব্রহ্মপুত্র মিলিয়াছে। ভারতের বিদ্যার স্রোতেও সেইরূপ মিলন ঘটিয়াছে। বাহির হইতে মুসলমান যে জ্ঞান ও ভাবের ধারা এখানে বহন করিয়া আনিয়াছে সেই ধারা ভারতের চিত্তকে স্তরে স্তরে অভিষিক্ত করিয়াছে, তাহা আমাদের ভাষায় আচারে শিল্পে সাহিত্যে সংগীতে নানা আকারে প্রকাশমান। অবশেষে সম্প্রতি ইউরোপীয় বিদ্যার বন্যা সকল বাঁধ ভাঙ্গিয়া দেশকে প্লাবিত করিয়াছে।……

“অতএব, আমাদের বিদ্যায়তনে বৈদিক, পৌরাণিক, বৌদ্ধ, জৈন, মুসলমান ও পার্সি বিদ্যার সমবেত চর্চায় আনুষঙ্গিকভাবে ইউরোপীয় বিদ্যাকে স্থান দিতে হইবে।”-শিক্ষা-রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ.৩১৬।

মাতৃভাষা বাংলাকে নিয়ে যে দুই জন বিষ্ময়কর ঘটনা ঘটিয়েছেন তাঁদের মধ্যে একজন রবীন্দ্রনাথ অপরজন শেখ মুজিবুর রহমান। এ দু’জনই বাংলা ভাষা ও বাঙ্গালিকে বিশ্বের দুয়ারে গর্ব ও গৌরবের আসনে অধিষ্ঠিত করেন। শেখ মুজিবুর রমহমান’ই প্রথম জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দেন।

১৯৩৭ সনের ১১ ফেব্রুয়ারী বাংলা ভাষার জন্য এক গৌরবময় দিন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসব। উদ্বোধক কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ তাঁর উদ্বোধনী ভাষণ বাংলায় প্রদান করেন। এর আগে এদেশের আর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে বা কোন উৎসবেই কেহ বাংলায় ভাষণ প্রদান করেন নি। সমাবর্তন উৎসবে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ আমাদের ভাষা সমস্য সমন্ধে বলেন,Ñ “ভারতবর্ষ ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোন দেশের’ই শিক্ষার ভাষা এবং শিক্ষার্থীর ভাষার মধ্যে আত্মীয়তা-বিচ্ছেদের অস্বাভাবিকতা দেখা যায় না।…… দীর্ঘকাল ধরে আমাদের প্রতি এই অবজ্ঞা আমরা সহজেই শিকার করে এসেছি। …… আমাদের দেশে শিক্ষার মধ্যে যে প্রভেদ সে ঐ সাহারা ওয়েসিসের মতো, অর্থাৎ পরিমাণগত ভেদ এবং জাতিগত ভেদ।” -ছাত্র ভাষণ, শিক্ষা-পৃ.২৫০-২৬০। রবীন্দ্রনাথ শুধু ইংরেজ তোষক ছিলেন না এই ভাষণ তাই প্রমাণ করে। তাছাড়া তিনি …… সালে নাইট উপাধিও প্রত্যাখান করেন।

বাংলা যদি বাঙ্গালি মুসলমানের মাতৃভাষা হয়, তবে সেই ভাষার মধ্য দিয়েই তাহাদের মুসলমানিও সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ হইতে পারে। বর্তমান বাংলা সাহিত্যে মুসলমান লেখকরা প্রতিদিন তাহার প্রমাণ দিতেছেন। তাঁহাদের মধ্যে যাঁহারা প্রভাবশালী তাঁহারা এই ভাষাতেই অমরতা লাভ করিবেন। শুধু তাই নয় বাংলা ভাষাতেও তাঁহারা মুসলমানি মাল মসলা বাড়াইয়া দিয়া ইহাকে আরো জুড়ালো করিয়া তুলিতে পারিবেন।- সাহিত্য সম্মিলন, রবীন্দ্র রচনাবলী অষ্টম খন্ড, পৃ.৪৮৫।

বাঙলা ও বাঙালি এবং ভাষা ও জাতিসত্তায় রবীন্দ্রনাথের কোন সংকীর্ণতা ছিল না বলেই তিনি গেয়েছেন-

বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ূ, বাংলার ফলÑ

পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান\

বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠÑ

পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক হে ভগবান\

বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা।Ñ

সত্য হউক, সত্য হউক, হে ভগবান\

বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোনÑ

এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান\

“বাংলা ভাষা অন্য কথায় বলা যায় মাতৃভাষা বাংলা প্রশ্নে রবীন্দ্র মানসে কোনো খণ্ডিত রেখা বা সীমাবদ্ধতা ছিল না। ইংরেজ আমাদের অনেক ক্ষতির মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষতি ও সবচেয়ে বড় শত্রুতা করেছে শিকল টেনে বাংলাদেশকে বিভক্ত করে। আজকের বাংলাদেশ ইংরেজদের শিকল টাকা খণ্ডিত বাংলাদেশ। এই শিকল টেনে খণ্ডিত জাতি বিচ্ছেদ হয়েছে, আমাদের আত্মিক ও সামাজিক বিশ্বাসের ফাটল ধরেছেÑশত্রুতা ও সাম্প্রদায়িকতা বেড়েছে। ভাইয়ে বুকে ছুড়ি মেরেছে সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িকতার উন্মত্ততায় আমরা রক্তের হোলি উৎসব করেছি।

পাকিস্তান আমলে এই শত্রুতা সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসী তৎপরতা আরো বেশী চরম ও উৎকট রূপ লাভ করেছে। রবীন্দ্রনাথ অতীব সূক্ষ্ম ও দূরদৃষ্টি দিয়ে দেখেছিলেন এর মূলে রয়েছে ভাষা বিচ্ছেদ। চর্যাপদের ভাষা নিয়ে যে এতো বিতর্ক ও সমস্যা এর মূলেও এই ভাষা বিচ্ছেদ ইংরেজের শিকল টানা বাংলাদেশের বৃত্তে আবদ্ধ বলেই আজ আমাদের ভাষা সমস্যা ও জাতিগত সমস্যা এবং আমাদের ভাষা ও জাতিসত্তা নিয়ে এত বিতর্ক।”- শিক্ষার মাধ্যম, মাতৃভাষা ও রবীন্দ্রনাথ, ড. সফিউদ্দিন আহমদ, পৃ.৭৯।

১৮৯৯ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে কলকাতায় বিচারপতি সৈয়দ আমির আলীর সভাপতিত্বে অষষ ওহফরধ গড়যধসসবফধহ ঊফঁপধঃরড়হধষ পড়হভবৎবহপব এর ত্রয়োদশ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সম্মেলনের তৃতীয় অধিবেশনে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ‘বঙ্গে-মাতৃভাষা শিক্ষা বিষয়ক একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। উক্ত প্রবন্ধে তিনি মাতৃভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে প্রবর্তনের উপর গুরুত্বারোপ করেন। নওয়াব আলী চৌধুরী তার বক্তব্যে প্রাথমিক শিক্ষা সহ মাতৃভাষার বিদ্যালয়গুলোতে মুসলিম ছাত্রদের জন্য পাঠ্যপুস্তক সমস্যা ও অন্যান্য কিছু প্রতিবন্ধকতার অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি বলেন যে, মাতৃভাষার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো গ্রামে ও শহরে হিন্দু প্রধান অঞ্চলে অবস্থিত থাকায় মুসলিম ছাত্ররা সহজে পাঠের সুযোগ পায় না। তাঁর মতে স্কুল পরিদর্শকের নির্দেশক্রমে এসব বিদ্যালয়ের স্থান নির্বাচন ও নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। তাঁর দ্বিতীয় অভিযোগ ছিল শিক্ষা-বিভাগের কর্মচারীদের মধ্যে হিন্দুর সংখ্যাই অধিক এবং বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে হিন্দু দেবদেবী, কৃষ্টি ও ইতিহাসের বিষয় বেশি পড়ানো হয়। এগুলো মুসলিম শিশুদের চরিত্র গঠনে সহায়ক নয়। হিন্দু রচিত বাংলা পাঠ্যপুস্তকে মুসলিম ইতিহাস ও জীবনাচরণের তেমন উল্লেখ পাওয়া যায় না। কোনো ক্ষেত্রে মুসলমানদের প্রসঙ্গ উল্লেখিত হলেও তার অধিকাংশই বিকৃত ও মনগড়া। ফলে মুসলিম নিজেদের ঐতিহ্য সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যায়। উপরন্তু ঐ সমস্ত বিষয় পাঠ করার ক্ষেত্রে মুসলিম ছাত্রের কোনো আকর্ষণ থাকে না। যার ফলে তারা বিদ্যালয়ের শিক্ষার প্রতি অমনোযোগী হয়। সুতরাং এর অবসান ঘটিয়ে বাঙালি মুসলিম ছাত্রদের উপযোগী বাংলা পুস্তক রচনা করা উচিত। নওয়াব আলী চৌধুরী, বার্নাকুলার এডুকেশন ইন বেঙ্গল, কলকাতা-১৯৯০, পৃ. ৩-৩৪। নবাব আলী চৌধুরীর বক্তবের প্রতি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) দৃষ্টি আকৃষট হয়েছিল। তিনি ভারতী পত্রিকায় মুসলিম শিক্ষার্থীদের উপযোগী পাঠ্যপুস্তকের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নওয়াব আলী চৌধুরীর সাথে ঐকমত্য পোষণ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেনÑ

বাঙ্গালা স্কুলে প্রচলিত পাঠ্যপুস্তকগুলি বিশেষরূপে হিন্দু ছাত্রদের পাঠোপযোগী করিয়া প্রস্তুত হইয়া থাকে, অথচ বাঙ্গালার অনেক প্রদেশেই হিন্দু অপেক্ষা মুসলমান প্রজা সংখ্যা অধিক-ইহা লইয়া সৈয়দ সাহেব আক্ষেপ প্রকাশ করিয়াছেন। বিষয়টি আলোচ্য তাহার সন্দেহ নাই এবং বক্তা মহাশয়ের সহিত আমাদের সহানুভূতি আছে।… এইরূপ হইবার প্রধান কারণ, এতদিন বিদ্যালয়ে হিন্দু ছাত্রসংখ্যাই অধিক ছিল এবং মুসলমান লেখকগণ বিশুদ্ধ বাঙ্গালা সাহিত্য রচনায় অগ্রসর হন নাই। কিন্তু ক্রমশই মুসলমান ছাত্রসংখ্যা বাড়িয়ে চলিয়াছে এবং ভাল বাঙ্গালা লিখিতে পারেন এমন মুসলমান লেখকেরও অভাব নাই। অতএব মুসলমান ছাত্রদের প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া পাঠ্যপুস্তক রচনার সময় আসিয়াছে…।… সৈয়দ সাহেব বাঙ্গালী মুসলমান বালকের শিক্ষার প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া যে কথা বলিয়াছেন, আমরা হিন্দু বালকের শিক্ষার প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া ঠিক সেই কথা বলি-অর্থাৎ বাঙ্গালা বিদ্যালয়ে হিন্দু ছেলের পাঠ্য-পুস্তকে তাহার স্বদেশীয় নিকটতম প্রতিবেশী মুসলমানদের কোন কথা না থাকা অন্যায় এবং অসঙ্গত। রবীন্দ্রনাত ঠাকুর, মুসলমান ছাত্রের বাঙ্গালা শিক্ষা, ভারতী কার্তিক, ১৩০৭, পৃ. ৩২০-২১।

রবীন্দ্রনাথের এই বক্তব্যে মুসলিম শিক্ষার প্রতি তাঁর ইতিবাচক মনোভাব পরিলক্ষিত হয়।

১৯২৬ সালের ২১ এপ্রিল শান্তিনিকেতনের মন্দিরে ভাষণ দান কালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আক্ষেপ করে বলেন:

আমরা নাকি ধর্ম প্রাণ জাতি! তাই তো আজ দেখছি ধর্মের নামে পশুত্ব দেশ জুড়ে বসেছে। বিধাতার নাম নিয়ে একে অন্যকে নির্মম আঘাতে হিংস্র পশুর মতো মারছে! এই কি হলো ধর্মের চেহারা ? এই মোহমুগ্ধ ধর্মবিভীষিকার চেয়ে সোজাসুজি নাস্তিকতা অনেক ভালো। ঈশ্বরদ্রোহী পাশবিকতাকে ধর্মের নামাবলী পরালে যে কী বিভৎস হয়ে ওঠে তা চোখ খুলে একটু দেখলেই বেশ দেখা যায়। আজ মিছে-ধর্মকে পুড়িয়ে ফেলে ভারত যদি খাঁটি-ধর্ম, খাঁটি আস্তিকতা পায়, তবে ভারত সত্যই নবজীবন লাভ করবে। নাস্তিকতার আগুনে তার সব ধর্মাবকারকে দাহ করা ছাড়া, একেবারে নতুন করে আরম্ভ করা ছাড়া আর কী পথ আছে, বুঝতে তো পাচ্ছি নে।- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ধর্ম ও জড়তা, প্রবাসী আষাঢ়, ১৩৩৩ পৃ. ৪৪৬-৪৭।

কবির এই চিন্তার প্রতিফলন ঘটে তাঁর বিখ্যাত ‘ধর্মমোহ’ কবিতায়। ব্যথিত চিত্তে কবি লিখলেন:

ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে

অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।

নাস্তিক সে-ও পায় বিধাতার বর,

ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর।

শ্রদ্ধা করিয়া জ্বালে বুদ্ধির আলে,-

শাস্ত্র মানে না, মানে মানুষের ভালো।

ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো,

এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলো আনো।-কবির পরিশেষ কাব্যগ্রন্থের অন্র্Íগত।

হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সংঘটিত নারকীয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কবিচিত্তকে করে তোলে বিক্ষুদ্ধ। এই সাম্প্রদায়িক সমস্যা সম্পর্কে মত প্রকাশ করলেন তাঁর বিখ্যাত “হিন্দু মুসলমান” শীর্ষক প্রবন্ধে। কবি এখানে সাম্প্রদায়িক সমস্যার উৎপত্তি ও তাৎপর্য সম্পর্কে সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করেছেন।

ইতিমধ্যে বাংলাদে েঅকথ্য ববর্বরতা বারা বারে আমাদের সহ্য করতে হয়েছে। জার-শাসনের আমলে এই রকম অত্যাচার রাশিয়ায় প্রায় ঘটত। বর্তমানে বিপ্লবপ্রবণ পলিটিক্যাল যুগের পূবের্ব আমাদের দেশে এ রকম দানবিক কান্ড কখনো শোনা যায়নি। ব্রিটিশ শাসিত ভারতে বহু গৌরবের খধ িধহফ ড়ৎফবৎ পদার্থটা বড় বড় শহরে পুলিস পাহারায় জাগ্রত দৃষ্টির সামনে স্পর্দ্ধা সহকারে উপরি উপরি অবমানিত হতে লাগল ঠিক এই বিশেষ সময়টাতেই। মারের দুঃখ কেবল আমাদের পিঠের উপর দিয়েই গেলো না, ওটা প্রবেশ করেছে বুকের ভিতরে। এটা এমন সময়ে ঘটল ঠিক যখন হিন্দু মুসলমানে কণ্ঠ মিলিয়ে দাঁড়াতে পারলে আমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হ’ত, বিশ্বসভার কাছে আমাদের মাথা হেট হ’ত না। এই রকমের অমানুসিক ঘটনায় লোক-স্মৃতিকে চিরদিনের মত বিষাক্ত করে তোলে, দেশের ডান হাতে বাঁ হাতে মিল করিয়ে ইতিহাস গড়ে তোলা দুঃসাধ্য হয়। কিন্তু তাই বলেই কি হাল ছেড়ে দেওয়া চলে না, গ্রন্থি জটিল হয়ে পাকিয়ে উঠেছে বলে ক্রোধের বেগে সেটাকে টানা টানি করে আরও আঁট করে তোলা মূঢ়তা। বর্তমানের ঝাঁজে ভবিষ্যতের বীজটাকে পর্যন্ত অফলা করে ফেলা স্বজাতিক আত্মহত্যার প্রণালী। নানা আশু ও সুদূর কারণে, অনেক দিনের পুঞ্জিত অপরাধে হিন্দু মুসলমানের মিলন সমস্যা কঠিন হয়েছে, সেজন্যই অবিলম্বে এবং দৃঢ় সংকল্পের সঙ্গে তার সমাধানের প্রবৃত্ত হতে হবে। অপ্রসন্ন ভাগ্যের উপর রাগ করে তাকে দ্বিগুণ হন্যে করে তোলা চোরের উপর রাগ করে মাটিকে ভাত খাওয়ার মতো।”-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘হিন্দু-মুসলমান’, প্রবাসী, শ্রাবণ, ১৩৩৮, পৃ. ৪৫৪।

১৯৩২ সালের মে ও জুন মাসে বোম্বাইয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়। এই সাম্প্রদায়িত দাঙ্গায় বহু সংখ্যক লোক নিহত ও আহত হয়েছিলো। পারশ্য ভ্রমণ শেষে ১৯৩২ সালের ৩১ মে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বদেশে প্রত্যাবর্থন করে এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি সাংবাদিকদের নিকট বলেন “যে সাম্প্রদায়িক তীব্রতা আমি এদেশে দেখিতেছি, পারস্যে আমি সেসব কিছুই দেখি নাই।’ রবীন্দ্র প্রসঙ্গ, আনন্দ বাজার পত্রিকা, কলকাতা ১৯৯৬, কলকাতা আনন্দ ১৯৯৬, তৃতীয় খন্ড, পৃ.৩০৯-১১।

১৯৩৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী মুর্শিদাবাদে ‘নিখিল বঙ্গ হিন্দু মুসলমান ঐক্য সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলার প্রায় সকল জেলা হতে প্রায় সাত শত প্রতিনিধি ও দর্শক এই ‘নিখিল বঙ্গ হিন্দু-মসলমান ঐক্য সম্মেলনে’ যোগদান করেন। এই ঐক্য সম্মেলনের সাফল্য কামনা করে যাঁরা শুভেচ্ছাজ্ঞাপক বাণীসমূহ প্রেরণ করেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তাঁদের অন্যতম। রবীন্দ্র প্রসঙ্গ, আনন্দ বাজার পত্রিকা, কলিকাতা, আনন্দ-২০০২, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ.৫৪০।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল তীব্রভাবে ঘৃণা করেছেন। ১৯২৬ সালে এপ্রিল, মে ও জুলাই মাসে কোলকাতায় সংঘটিত হয় জঘন্য সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এই দাঙ্গার কারণ ছিল মসজিদের সম্মুখে বাদ্য-বাজনা এবং এ সময় শতাধিক ব্যক্তির প্রাণহানী ঘটে। কাজী নজরুল ইসলাম এসময় রচনা করেন “মন্দির ও মসজিদ” এক “হিন্দু-মুসলমান” শীর্ষক শিরোনামে দুটি লেখা এবং “হিন্দু-মুসলিম যুদ্ধ” নামে একটি কবিতা। “হিন্দু-মুসলমান” প্রবন্ধের প্রারম্ভেই নজরুল ইসলাম তাঁর সাথে এ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আলোচনার তথ্য প্রদান করে লিখেছেন যে: একদিন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিল আমরা, হিন্দু-মুসলমান সমস্যা নিয়ে। গুরুদেব বললেন: দেখো, যে ন্যাজ বাইরের, তাকে কাটা যায়, কিন্তু ভিতরের ন্যাজকে কাটবে কে ? হিন্দু-মুসলমানের কথা মনে উঠলে আমরা বারেবারে গুরুদেবের ওই কথাটাই মনে হয়। সঙ্গে সঙ্গে এপ্রশ্নও উদয় হয় মনে, যে এ-ন্যাজ গজালো কী করে ? এর আদি উদ্ভব কোথায় ? ওই সঙ্গে এটাও মনে হয়, ন্যাজ যাদেরই গজায় – তা ভিতরেই হোক আর বাইরে হোক – তারাই হয়ে ওঠে পশু। যে সব ন্যাজওয়ালা পশুর হিংস্রতা সরল হয়ে বেরিয়ে আসে বাইরে – শৃঙ্গরূপে, তাদের তত ভয়ের কারণ নেই, যত ভয় হয় সেই সব পশুদের দেখে – যাদের হিংস্রতা ভিতরে, যাদের শিং মাথা ফুটে বেরোয়নি! শিংওয়ালা গুরু-মহিষের চেয়ে শৃঙ্গহীন ব্যাঘ্র-ভল্লুকজাতীয় পশুগুলো বেশি হিংস্র – বেশি ভীষণ। এই হিসেবে মানুষও পড়ে ওই শৃঙ্গহীন বাঘ-ভালুকের দলে। কিন্তু বাঘ-ভালুকের তবু ন্যাজটা বাইরে, তাই হয়তো রক্ষে। কেননা, ন্যাজ আর শিং দুই-ই ভেতরে থাকলে কীরকম হিংস্র হয়ে উঠতে হয়, তা হিন্দু-মুসলমানের ছোরা-মারা না দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না।কাজী নজরুল ইসলাম, রচনা সমগ্র, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ.৪৪৫-৪৬।

মুসলিম বিদ্বেশ প্রসঙ্গ ঃ রবীন্দ্রবিরোধীরা প্রমাণ করতে চান যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মুসলিম বিদ্বেষী ছিলেন তাই মুসলিমদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় করতে চান নি। তাই যদি হয় তবে এর অনেক আগেই কেন তিনি মুসলিম কৃষকদের যাতে ভালো হয়, সে চিন্তা করেছিলেন ? ১৯০৫ সালে কবি মহাজনদের হাত থেকে কৃষকদের মুক্ত করার জন্য পতিসরে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেছিলেন। এমনকি নিজের নোবেল পুরস্কারের ১ লক্ষ ৮ হাজার টাকা এই ব্যাংকে বিনিয়োগ করেছিলেন। পতিসরের প্রজারা বেশির ভাগ মুসলিম ছিলেন। আবার ১৯৩৭ সালে পতিসর ছেড়ে যাওয়ার সময় সব সম্পদ প্রজাদের মধ্যে দান করে গিয়েছিলেন। কোন মুসলমান যে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেন নি তা ঠিক নয়। নবাব স্যার সলিমুল্লাহর ভাই আতিকুল্লাহ ১৯০৬ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে এক প্রস্তাব উত্থাপন করে বলেন, -‘আমি আপনাদেরকে বলতে পারি যে পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা বঙ্গবঙ্গের স্বপক্ষে একথাটা ঠিক নয়। আসলে কিছু সংখ্যার মহামেডান নিজেদের স্বার্থে এ ব্যবস্থা সমর্থন করেছেন।’Ñ রাম গোপাল ওহফরধহ গঁংষরস ধ ঢ়ড়ষরঃরপধষ ঐরংঃড়ৎু-ঢ়-২৩ ও এ.আর মল্লিক ঞযব গঁংষরস ধহফ ঃযব চধৎঃরঃরড়হ ঙভ ইবহমধষ, ১৯০৫: ঐরংঃড়ৎু ঙভ ঃযব ভৎববফড়স গড়াবসবহঃ,ঠড়ষ-১১১, চধৎঃ-১.শুধু পতিসরেই নয়, শাহজাদপুরেও (সাজাদপুরে) মুসলিম প্রজাদের গরু পালনের জন্য নিজের জায়গা দিয়েছিলেন। এতে স্পষ্ট প্রমাণ হয় তিনি হিন্দু-মুসলিম নন, মানুষকে ভালোবাসতেন। মানুষের জন্য কাজ করতেন।

মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী নেতৃত্বাধীন জমিয়তুল ওলামায়ে ই-হিন্দ লাহোর প্রস্তাবের পর থেকে পাকিস্তানের বিরোধিতা করতে থাকেন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে এরা ভারত বিভক্তি ও পাকিস্তানের বিরোধী এবং ভারতীয় কংগ্রেসের সমর্থক ছিলেন। ভারতের মুসলমান ও স্বাধীনতার আন্দোলন মোহাম্মদ ইনাম-উল-হক, পৃ. ২২৮-২৯।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়াার করুন

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.