সংবাদ শিরোনাম
ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তির সুযোগে হাইকোর্টের রুল  » «   মাধ্যমিকে ভর্তি আবেদনের সময় বাড়ল  » «   একজন মানুষ তাঁর কর্মের মাধ্যমে সবার কাছে প্রিয় বা অপ্রিয় হন: চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাউছার আহমদ  » «   পদত্যাগ করলেন মুরাদ হাসান  » «   সংবাদ সম্মেলনে প্রবাসীর অভিযোগ:‘অন্যায়ভাবে আমাদের বাসাবাড়ি ভেঙে দিয়েছেন মেয়র আরিফ’  » «   সুনামগঞ্জের সদরগড়ে দুইপক্ষের ঝগড়া থামাতে গিয়ে এক সালিশকে পিঠিয়ে হত্যা  » «   জৈন্তাপুরে সিজদারত অবস্থায় এক ইমামের মৃত্যু  » «   সিলেটে আসছে শীত বদলে যাচ্ছে তাপমাত্রা-কাপড়ের দোকানে ক্রেতাদের ভিড়  » «   কুলাউড়ায় নবনির্বাচিত হাজিপুর ইউপি চেয়ারম্যানের ইন্ধনে সীমানা প্রাচীর ভাংচুর  » «   সুনামগঞ্জে ছাত্রদলের মিছিলে পুলিশের বাঁধা  » «   ইংল্যান্ডে প্রতি ৬০ জনে একজন কোভিড আক্রান্ত  » «   ছাতকের তেরা মিয়া হত্যা মামলায় একজনকে যাবজ্জীবন ও ৯ জনকে কারাদন্ড  » «   দোয়ারাবাজারে কাজ করতে দেরি হওয়ায় দোকান ভাঙচুর, মারধর   » «   সিলেটে বর্ণাঢ্য আয়োজনে বরণ করা হয়েছে বিজয়ের মাস ডিসেম্বরকে  » «   কানাইঘাটের আনন্দ কমিউনিটি সেন্টারে শোকের ছায়া-নারী বাবুর্চি সহ দু-জনের লাশ উদ্ধার  » «  

শতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গ – ৫ম পর্ব

লেখক মোঃ আব্দুল মালিক:: পূর্ব প্রকাশিতের পর

মুসলিম বিদ্বেষ প্রসঙ্গ: রবীন্দ্রবিরোধীরা প্রমাণ করতে চান যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মুসলিম বিদ্বেষী ছিলেন তাই মুসলিমদের উপকারার্থে যে ‘বঙ্গভঙ্গ’ ও ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ তিনি এর বিরোধিতা করেছেন। এমনকি রবীন্দ্র সাহিত্যে মুসলিম চরিত্র বিরল মুসলিম বিদ্বেষ প্রসঙ্গ নিয়ে এখানে কিঞ্চিৎ আলোচনা।

‘১৮৯৯ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে কলকাতায় বিচারপতি সৈয়দ আমির আলীর সভাপতিত্বে অষষ ওহফরধ গড়যধসসবফধহ ঊফঁপধঃরড়হধষ পড়হভবৎবহপব এর ত্রয়োদশ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সম্মেলনের তৃতীয় অধিবেশনে সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী ‘বঙ্গে-মাতৃভাষা শিক্ষা বিষয়ক একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। উক্ত প্রবন্ধে তিনি মাতৃভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে প্রবর্তনের উপর গুরুত্বারোপ করেন। নওয়াব আলী চৌধুরী তঁার বক্তব্যে প্রাথমিক শিক্ষাসহ মাতৃভাষার বিদ্যালয়গুলোতে মুসলিম ছাত্রদের জন্য পাঠ্যপুস্তক সমস্যা ও অন্যান্য কিছু প্রতিবন্ধকতার অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি বলেন যে, মাতৃভাষার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো গ্রামে ও শহরে হিন্দু প্রধান অঞ্চলে অবস্থিত থাকায় মুসলিম ছাত্ররা সহজে পাঠের সুযোগ পায় না। তাঁর মতে, স্কুল পরিদর্শকের নির্দেশক্রমে এসব বিদ্যালয়ের স্থান নির্বাচন ও নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। তাঁর দ্বিতীয় অভিযোগ ছিল শিক্ষা-বিভাগের কর্মচারীদের মধ্যে হিন্দুর সংখ্যাই অধিক এবং বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে হিন্দু দেবদেবী, কৃষ্টি ও ইতিহাসের বিষয় বেশি পড়ানো হয়। এগুলো মুসলিম শিশুদের চরিত্র গঠনে সহায়ক নয়। হিন্দু রচিত বাংলা পাঠ্যপুস্তকে মুসলিম ইতিহাস ও জীবনাচরণের তেমন উল্লেখ পাওয়া যায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুসলমানদের প্রসঙ্গ উল্লেখিত হলেও তার অধিকাংশই বিকৃত ও মনগড়া। ফলে মুসলিম ছাত্ররা নিজেদের ঐতিহ্য সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যায়। উপরন্তু ঐ সমস্ত বিষয় পাঠ করার ক্ষেত্রে মুসলিম ছাত্রের কোনো আকর্ষণ থাকে না। যার ফলে তারা বিদ্যালয়ের শিক্ষার প্রতি অমনোযোগী হয়। সুতরাং এর অবসান ঘটিয়ে বাঙালি মুসলিম ছাত্রদের উপযোগী বাংলা পুস্তক রচনা করা উচিত।’ (নওয়াব আলী চৌধুরী, বার্নাকুলার এডুকেশন ইন বেঙ্গল, কলকাতা-১৯৯০, পৃ. ৩-৩৪)। নওয়াব আলী চৌধুরীর এই বক্তবের প্রতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছিল। তিনি ভারতী পত্রিকায় মুসলিম শিক্ষার্থীদের উপযোগী পাঠ্যপুস্তকের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নওয়াব আলী চৌধুরীর সাথে ঐক্যমত্য পোষণ করে বলেনÑ ‘বাঙ্গালা স্কুলে প্রচলিত পাঠ্যপুস্তকগুলি বিশেষরূপে হিন্দু ছাত্রদের পাঠোপযোগী করিয়া প্রস্তুত হইয়া থাকে, অথচ বাঙ্গালার অনেক প্রদেশেই হিন্দু অপেক্ষা মুসলমান প্রজা সংখ্যা অধিক-ইহা লইয়া সৈয়দ সাহেব আক্ষেপ প্রকাশ করিয়াছেন। বিষয়টি আলোচ্য তাহাতে সন্দেহ নাই এবং বক্তা মহাশয়ের সহিত আমাদের সহানুভূতি আছে।… এইরূপ হইবার প্রধান কারণ, এতদিন বিদ্যালয়ে হিন্দু ছাত্রসংখ্যাই অধিক ছিল এবং মুসলমান লেখকগণ বিশুদ্ধ বাঙ্গালা সাহিত্য রচনায় অগ্রসর হন নাই। কিন্তু ক্রমশই মুসলমান ছাত্রসংখ্যা বাড়িয়ে চলিয়াছে এবং ভাল বাঙ্গালা লিখিতে পারেন এমন মুসলমান লেখকেরও অভাব নাই। অতএব মুসলমান ছাত্রদের প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া পাঠ্যপুস্তক রচনার সময় আসিয়াছে…।… সৈয়দ সাহেব বাঙ্গালী মুসলমান বালকের শিক্ষার প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া যে কথা বলিয়াছেন, আমরা হিন্দু বালকের শিক্ষার প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া ঠিক সেই কথা বলি-অর্থাৎ বাঙ্গালা বিদ্যালয়ে হিন্দু ছেলের পাঠ্য-পুস্তকে তাহার স্বদেশীয় নিকটতম প্রতিবেশী মুসলমানদের কোন কথা না থাকা অন্যায় এবং অসঙ্গত।’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মুসলমান ছাত্রের বাঙ্গালা শিক্ষা, ভারতী, কার্তিক, ১৩০৭, পৃ. ৩২০-২১)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই বক্তব্য থেকে মুসলিমদের প্রতি তাঁর ইতিবাচক মনোভাব পরিলক্ষিত হয়।

রবীন্দ্রনাথের কৃষি, কৃষক ও কৃষি ব্যাংক ভাবনা এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।  ১৯০৫ সালে কবি মহাজনদের হাত থেকে দরিদ্র কৃষকদের মুক্ত করার জন্য পতিসরে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেছিলেন। এমনকি নিজের নোবেল পুরস্কারের ১ লক্ষ ৮ হাজার টাকা এই ব্যাংকে বিনিয়োগ করেছিলেন। পতিসরের প্রজারা বেশির ভাগ মুসলিম ছিলেন। আবার ১৯৩৭ সালে পতিসর ছেড়ে যাওয়ার সময় সব সম্পদ প্রজাদের মধ্যে দান করে গিয়েছিলেন। শুধু পতিসরেই নয়, শাহজাদপুরেও মুসলিম প্রজাদের গরু পালনের জন্য নিজের জায়গা দিয়েছিলেন। এতে স্পষ্ট প্রমাণ হয় তিনি হিন্দু-মুসলিম নন, মানুষকে ভালোবাসতেন। মানুষের জন্য কাজ করতেন।

রবীন্দ্রনাথ কোনো সংকীর্ণতা বিশ্বাস করতেন না। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সমগ্র বিশ্বের যা ভালো ও মহৎ তা সবই আত্মস্থ করে গ্রহণ করার জন্য রবীন্দ্রনাথ নিজের অভিমত পোষণ করেছেনÑ “বিদ্যার নদী আমাদের দেশে বৈদিক, পৌরাণিক, বৌদ্ধ, জৈন, প্রধানত এই চারি শাখায় প্রবাহিত। ভারত-চিড়িগঙ্গোত্রীতে ইহার উদ্ভব। কিন্তু, দেশে যে নদী চলিতেছে,  কেবল সেই দেশের জলে সেই নদী পুষ্ট না হইতেও পারে। ভারতের গঙ্গার সঙ্গে তিব্বতের ব্রহ্মপুত্র মিলিয়াছে। ভারতের বিদ্যার স্রোতেও সেইরূপ মিলন ঘটিয়াছে। বাহির হইতে মুসলমান যে জ্ঞান ও ভাবের ধারা এখানে বহন করিয়া আনিয়াছে সেই ধারা ভারতের চিত্তকে স্তরে স্তরে অভিষিক্ত করিয়াছে, তাহা আমাদের ভাষায় আচারে শিল্পে সাহিত্যে সংগীতে নানা আকারে প্রকাশমান। অবশেষে সম্প্রতি ইউরোপীয় বিদ্যার বন্যা সকল বাঁধ ভাঙ্গিয়া দেশকে প্লাবিত করিয়াছে।……

“অতএব, আমাদের বিদ্যায়তনে বৈদিক, পৌরাণিক, বৌদ্ধ, জৈন, মুসলমান ও পার্সি বিদ্যার সমবেত চর্চায় আনুষঙ্গিকভাবে ইউরোপীয় বিদ্যাকে স্থান দিতে হইবে।”-শিক্ষা-রবীন্দ্র রচনাবলী-১২, পৃ.৩১৬।

‘বাংলা যদি বাঙ্গালি মুসলমানের মাতৃভাষা হয়, তবে সেই ভাষার মধ্য দিয়েই তাহাদের মুসলমানিও সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ হইতে পারে। বর্তমান বাংলা সাহিত্যে মুসলমান লেখকেরা প্রতিদিন তাহার প্রমাণ দিতেছেন। তাঁহাদের মধ্যে যাঁহারা প্রভাবশালী তাঁহারা এই ভাষাতেই অমরতা লাভ করিবেন। শুধু তাই নয় বাংলাভাষাতে তাঁহারা মুসলমানি মালমসলা বাড়াইয়া দিয়া ইহাকে আরো জোরালো করিয়া তুলিতে পারিবেন।’- সাহিত্য সম্মিলন, রবীন্দ্র রচনাবলী অষ্টম খন্ড, পৃ.৪৮৫।

১৯২৬ সালের ২১ এপ্রিল শান্তিনিকেতনের মন্দিরে ভাষণ দান কালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা নাকি ধর্মপ্রাণ জাতি! তাই তো আজ দেখছি ধর্মের নামে পশুত্ব দেশ জুড়ে বসেছে। বিধাতার নাম নিয়ে একে অন্যকে নির্মম আঘাতে হিংস্র পশুর মতো মারছে! এই কি হলো ধর্মের চেহারা ? এই মোহমুগ্ধ ধর্মবিভীষিকার চেয়ে সোজাসুজি নাস্তিকতা অনেক ভালো। ঈশ্বরদ্রোহী পাশবিকতাকে ধর্মের নামাবলী পরালে যে কী বিভৎস হয়ে ওঠে তা চোখ খুলে একটু দেখলেই বেশ দেখা যায়। আজ মিছে-ধর্মকে পুড়িয়ে ফেলে ভারত যদি খাঁটি-ধর্ম, খাঁটি আস্তিকতা পায়, তবে ভারত সত্যই নবজীবন লাভ করবে। নাস্তিকতার আগুনে তার সব ধর্মবিকারকে দাহ করা ছাড়া, একেবারে নতুন ক’রে আরম্ভ করা ছাড়া আর কী পথ আছে, বুঝতে তো পাচ্ছি নে।’- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ধর্ম ও জড়তা, প্রবাসী আষাঢ়, ১৩৩৩ পৃ. ৪৪৬-৪৭।

কবির এই চিন্তার প্রতিফলন ঘটে তাঁর বিখ্যাত ‘ধর্মমোহ’ কবিতায়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ব্যথিত চিত্তে কবি লিখলেন:

ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে,

অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।

নাস্তিক সে-ও পায় বিধাতার বর,

ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর।

শ্রদ্ধা করিয়া জ্বালে বুদ্ধির আলো,-

শাস্ত্র মানে না, মানে মানুষের ভালো।

ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো,

এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলো আনো।

-(কবির পরিশেষ কাব্যগ্রন্থের অন্র্Íগত)

হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সংঘটিত নারকীয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কবিচিত্তকে করে তোলে বিক্ষুদ্ধ। এই সাম্প্রদায়িক সমস্যা সম্পর্কে মত প্রকাশ করলেন তাঁর বিখ্যাত “হিন্দু মুসলমান” শীর্ষক প্রবন্ধে। কবি এখানে সাম্প্রদায়িক সমস্যার উৎপত্তি ও তাৎপর্য সম্পর্কে সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘ইতিমধ্যে বাংলাদেশে অকথ্য ববর্বরতা বারে বারে আমাদের সহ্য করতে হয়েছে। জার-শাসনের আমলে এই রকম অত্যাচার রাশিয়ায় প্রায় ঘটত। বর্ত্তমানে বিপ্লবপ্রবণ পলিটিক্যাল যুগের পূবের্ব আমাদের দেশে এ রকম দানবিক কান্ড কখনো শোনা যায়নি। ব্রিটিশ শাসিত ভারতে বহু গৌরবের খধ িধহফ ড়ৎফবৎ পদার্থটা বড় বড় শহরে পুলিস পাহারায় জাগ্রত দৃষ্টির সামনে স্পর্দ্ধা সহকারে উপরি উপরি অবমানিত হতে লাগল ঠিক এই বিশেষ সময়টাতেই। মারের দুঃখ কেবল আমাদের পিঠের উপর দিয়েই গেলো না, ওটা প্রবেশ করেছে বুকের ভিতরে। এটা এমন সময়ে ঘটল ঠিক যখন হিন্দু মুসলমানে কণ্ঠ মিলিয়ে দাঁড়াতে পারলে আমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হ’ত, বিশ্বসভার কাছে আমাদের মাথা হেট হ’ত না। এই রকমের অমানুসিক ঘটনায় লোক-স্মৃতিকে চিরদিনের মত বিষাক্ত করে তোলে, দেশের ডান হাতে বাঁ হাতে মিল করিয়ে ইতিহাস গড়ে তোলা দুঃসাধ্য হয়। কিন্তু তাই বলেই তো হাল ছেড়ে দেওয়া চলে না, গ্রন্থি জটিল হয়ে পাকিয়ে উঠেছে বলে ক্রোধের বেগে সেটাকে টানাটানি করে আরও আঁট করে তোলা মূঢ়তা। বর্ত্তমানের ঝাঁজে ভবিষ্যতের বীজটাকে পর্যন্ত অফলা করে ফেলা স্বজাতিক আত্মহত্যার প্রণালী। নানা আশু ও সুদূর কারণে, অনেক দিনের পুঞ্জিত অপরাধে হিন্দু মুসলমানের মিলন সমস্যা কঠিন হয়েছে, সেইজন্যেই অবিলম্বে এবং দৃঢ় সংকল্পের সঙ্গে তার সমাধানে প্রবৃত্ত হতে হবে। অপ্রসন্ন ভাগ্যের উপর রাগ করে তাকে দ্বিগুণ হন্যে করে তোলা চোরের উপর রাগ করে মাটিতে ভাত খাওয়ার মতো।”-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘হিন্দু-মুসলমান’, প্রবাসী, শ্রাবণ, ১৩৩৮, পৃ. ৪৫৪।

১৯৩২ সালের মে ও জুন মাসে বোম্বাইয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়। এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বহু সংখ্যক লোক নিহত ও আহত হয়েছিলো। পারস্য ভ্রমণ শেষে ১৯৩২ সালের ৩১ মে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “যে সাম্প্রদায়িক তীব্রতা আমি এদেশে দেখিতেছি, পারস্যে আমি সেসব কিছুই দেখি নাই।’ (কলকাতা আনন্দ ১৯৯৬, তৃতীয় খন্ড, পৃ.৩০৯-১১)।

১৯৩৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি মুর্শিদাবাদে ‘নিখিল বঙ্গ হিন্দু মুসলমান ঐক্য সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলার প্রায় সকল জেলা হতে প্রায় সাত শত প্রতিনিধি ও দর্শক এই ‘নিখিল বঙ্গ হিন্দু-মসলমান ঐক্য সম্মেলনে’ যোগদান করেন। এই ঐক্য সম্মেলনের সাফল্য কামনা করে যাঁরা শুভেচ্ছাজ্ঞাপক বাণী প্রেরণ করেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তাঁদের অন্যতম’। (রবীন্দ্র প্রসঙ্গ, আনন্দ বাজার পত্রিকা, কলিকাতা, আনন্দ-২০০২, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ.৫৪০)।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাকে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল তীব্রভাবে ঘৃণা করেছেন। ১৯২৬ সালে এপ্রিল, মে ও জুলাই মাসে কলকাতায় সংঘটিত হয় জঘন্য সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এই দাঙ্গার কারণ ছিল মসজিদের সম্মুখে বাদ্য-বাজানো। এ সময় শতাধিক ব্যক্তির প্রাণহানী ঘটে। কাজী নজরুল ইসলাম এসময় রচনা করেন “মন্দির ও মসজিদ” ও “হিন্দু-মুসলমান” শিরোনামে দুটি প্রবন্ধ এবং “হিন্দু-মুসলিম যুদ্ধ” নামে একটি কবিতা। “হিন্দু-মুসলমান” প্রবন্ধের প্রারম্ভেই নজরুল ইসলাম তাঁর সাথে এ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আলোচনার তথ্য প্রদান করে লিখেছেন, ‘একদিন গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছিল আমার, হিন্দু-মুসলমান সমস্যা নিয়ে। গুরুদেব বললেন দেখো, যে ন্যাজ বাইরের, তাকে কাটা যায়, কিন্তু ভিতরের ন্যাজকে কাটবে কে ? হিন্দু-মুসলমানের কথা মনে উঠলে আমার বারেবারে গুরুদেবের ওই কথাটাই মনে হয়। সঙ্গে সঙ্গে এ প্রশ্নও উদয় হয় মনে, যে এ-ন্যাজ গজালো কী করে ? এর আদি উদ্ভব কোথায় ? ওই সঙ্গে এটাও মনে হয়, ন্যাজ যাদেরই গজায় – তা ভিতরেই হোক আর বাইরে হোক – তারাই হয়ে ওঠে পশু। যে সব ন্যাজওয়ালা পশুর হিংস্রতা সরল হয়ে বেরিয়ে আসে বাইরে – শৃঙ্গরূপে, তাদের তত ভয়ের কারণ নেই, যত ভয় হয় সেই সব পশুদের দেখে – যাদের হিংস্রতা ভিতরে, যাদের শিং মাথা ফুটে বেরোয়নি! শিংওয়ালা গুরু-মহিষের চেয়ে শৃঙ্গহীন ব্যাঘ্র-ভল্লুকজাতীয় পশুগুলো বেশি হিংস্র – বেশি ভীষণ। এই হিসেবে মানুষও পড়ে ওই শৃঙ্গহীন বাঘ-ভালুকের দলে। কিন্তু বাঘ-ভালুকের তবু ন্যাজটা বাইরে, তাই হয়তো রক্ষে। কেননা, ন্যাজ আর শিং দুই-ই ভেতরে থাকলে কীরকম হিংস্র হয়ে উঠতে হয়, তা হিন্দু-মুসলমানের ছোরা-মারা না দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না’। (কাজী নজরুল ইসলাম, রচনা সমগ্র, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদামী, দ্বিতীয় খন্ড, পৃ.৪৪৫-৪৬)।

উপরের আলোচনা থেকে পাঠক সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কতোটা মুসলিম বিদ্বেষী ছিলেন বা আদৌ ছিলেন না। (বাকি ৬ষ্ঠ পর্বে)

তথ্যসূত্র-

১। ইতিহাসের আলোকে আমাদের শিক্ষার ঐতিহ্য ও প্রকৃতি-অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আলমগীর।

২। বৃটিশ আমলে বাংলার মুসলিম শিক্ষা সমস্যা ও প্রসার-মোঃ আব্দুল্লা আল মামুন।

৩। ভারতের মুসলমান ও স্বাধীনতা আন্দোলন-মুহাম্মদ-ইমাম-উল-হক।

৪। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রন্থিত ইতিহাস-ড. রতন লাল চক্রবর্তী।

৫। শিক্ষার মাধ্যম মাতৃভাষা ও রবীন্দ্রনাথ- ড. শফিউদ্দীন আহমদ।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়াার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.