সংবাদ শিরোনাম
ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তির সুযোগে হাইকোর্টের রুল  » «   মাধ্যমিকে ভর্তি আবেদনের সময় বাড়ল  » «   একজন মানুষ তাঁর কর্মের মাধ্যমে সবার কাছে প্রিয় বা অপ্রিয় হন: চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাউছার আহমদ  » «   পদত্যাগ করলেন মুরাদ হাসান  » «   সংবাদ সম্মেলনে প্রবাসীর অভিযোগ:‘অন্যায়ভাবে আমাদের বাসাবাড়ি ভেঙে দিয়েছেন মেয়র আরিফ’  » «   সুনামগঞ্জের সদরগড়ে দুইপক্ষের ঝগড়া থামাতে গিয়ে এক সালিশকে পিঠিয়ে হত্যা  » «   জৈন্তাপুরে সিজদারত অবস্থায় এক ইমামের মৃত্যু  » «   সিলেটে আসছে শীত বদলে যাচ্ছে তাপমাত্রা-কাপড়ের দোকানে ক্রেতাদের ভিড়  » «   কুলাউড়ায় নবনির্বাচিত হাজিপুর ইউপি চেয়ারম্যানের ইন্ধনে সীমানা প্রাচীর ভাংচুর  » «   সুনামগঞ্জে ছাত্রদলের মিছিলে পুলিশের বাঁধা  » «   ইংল্যান্ডে প্রতি ৬০ জনে একজন কোভিড আক্রান্ত  » «   ছাতকের তেরা মিয়া হত্যা মামলায় একজনকে যাবজ্জীবন ও ৯ জনকে কারাদন্ড  » «   দোয়ারাবাজারে কাজ করতে দেরি হওয়ায় দোকান ভাঙচুর, মারধর   » «   সিলেটে বর্ণাঢ্য আয়োজনে বরণ করা হয়েছে বিজয়ের মাস ডিসেম্বরকে  » «   কানাইঘাটের আনন্দ কমিউনিটি সেন্টারে শোকের ছায়া-নারী বাবুর্চি সহ দু-জনের লাশ উদ্ধার  » «  

কমিউনিস্ট বিপ্লবীনেতা কমরেড দ্বিজেন সোম স্মরণে

এড কুমার চন্দ্র রায়::অবিভক্ত ভারতের সময়কাল থেকে এযাব কাল পর্যন্ত যে কয়জন কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতা শ্রমিক শ্রেণির আদর্শ মার্কসবাদ লেনিনবাদের পতাকাকে প্রতিষ্ঠা করতে সকল রূপের সংশোধনবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীলতার
বিরুদ্ধে আদর্শগত সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন কমরেড দ্বিজেন সোম তাঁদের অন্যতম।

দীর্ঘ ৩৭ বছর আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় ২০০৩ সালে কমরেড দ্বিজেন সোম আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছেন। দিন তারিখ হিসেবে ২৭ জুন ২০২১ তাঁর ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অধিকাংশ সময় কমরেড দ্বিজেন সোম
চা শ্রমিক ও ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি শ্রমিকসহ বিভিন্ন সেক্টরের শ্রমিক, কৃষক ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাদের সংগঠন সংগ্রাম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদ মুক্ত শোষণহীন সাম্যবাদী সমাজ কায়েমের জন্য আজীবন লালিত স্বপ্নদ্রষ্টা মহান এ ব্যক্তির ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা নিবেদন হিসেবে তাঁরই জীবনের বিভিন্ন দিক ও রাজনীতি নিয়ে এই লেখার অবতারণা করছি।

কমরেড দ্বিজেন সোম হবিগঞ্জ জেলার সদর থানার অন্তর্গত মাছুলিয়া গ্রামে ১৯২১ সালের ১৪ নভেম্বর
জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল দীননাথ সোম এবং মায়ের নাম হেমানলীনি সোম। নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে তাঁর শৈশব অতিবাহিত হয় এবং লেখাপড়াও বেশিদূর অগ্রসর হয় নি। তিনি এক নিকট আত্মীয়ের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৩৭ সালে দোকান কর্মচারি থাকাবস্থায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন এবং অনুধাবন করেন সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদ বিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব ব্যাতীত জনগণের মুক্তি আসবে না।

এসব ভাবনায় তাঁর জীবনের মোড় পরিবর্তন হয় এবং ১৯৪১ সালে পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪৩ সালে হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং গ্রামে ম্যালেরিয়া মহামারি রূপে ছড়িয়ে পড়ে এবং
১০ হাজার মানুষ মারা যায়। তখনকার সময় কমিউনিস্ট পার্টি ত্রাণ কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। তিনি ঐ সময় প্রখ্যাত গণসঙ্গীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সাথে ত্রাণ কাজে অংশগ্রহণ করেন। অসুস্থ কমরেডদের চিকি সা ও সেবা শুশ্রুষার জন্য পার্টির প্রতিষ্ঠিত ক্লিনিকে (জবফ অরফ ঈঁৎব ঐড়সব) তিনি এক বছর কাজ করেন।

এরপর পার্টির নির্দেশে তিনি ট্রেড ইউনিয়ন তথা শ্রমিক সেক্টরের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৪৪
সালে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে শ্রমিক আন্দোলনে অঙ্গীরা শিং এর নেতৃত্বে যে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে উঠে তাতে ইউনিয়নের সহ-সম্পাদক হিসেবে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। এ সময় একটানা ৩৬ দিন ধর্মঘট সংঘটিত হয়। তখনকার সময়ে কমিউনিস্ট পাটির নেতৃত্বে প্রদেশব্যাপী তেভাগা কৃষক আন্দোলন এবং সিলেট অঞ্চলে পার্টির নেতৃত্বে নানকার প্রথা বিরোধী কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজে কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতা কমরেড অজয় ভট্টাচার্যের সাথে তিনি অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখেন। সর্বভারতীয় রেল ধর্মঘটের সহযোগিতায় তপরতা চালানোর সময় ১৯৪৯ সালে তিনি গ্রেফতার হন এবং ১৯৫৪ সালে কারামুক্ত হন।
১৯৬০ এর দশকে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে ক্রশ্চেভীয় সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে মার্কসবাদ লেনিনবাদের পক্ষে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন এর প্রেসিডেন্ট মহামতি কমরেড স্ট্যালিন এর মৃত্যুর পর ক্রুশ্চেভচক্র ক্ষমতায় এসে মার্কসবাদী-লেলিনবাদী তত্ত্বের বিপরীতে সামনে আনে ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান্থ, ‘শান্তিপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা্থ ও ‘শান্তিপূর্ণ পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ্থ এর সংশোধনবাদী তত্ত্ব। এই আকস্মিক বক্তব্যে বিশ্বের দেশে দেশে শ্রমিক শ্রেণি ও কমিউনিস্ট পার্টিতে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়।

আমাদের দেশে মনি সিংহ, বারীন দত্তের নেতৃত্বে পার্টির একাংশ ক্রুশ্চেভের নীতি সমর্থন করেন। কমরেড আব্দুল হক, মোহাম্মদ তোহা, সুখেন্দু দস্তিদারের নেতৃত্বে পার্টির অপর অংশ মনি সিংহ এর বক্তব্যের বিরুদ্ধে থিসিস দাখিল করেন। এ নিয়ে মতাদর্শিক প্রশ্নে কমিউনিস্ট পার্টি ও পার্টি প্রভাবাধীন সকল গণসংগঠন দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়ে। কমরেড দ্বিজেন সোম কমরেড আব্দুল হকদের বিপ্লবী লাইনকে সমর্থন করে সংগঠন সংগ্রামে ভূমিকা রাখেন।

বিশ্ববিপ্লব ও আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থকে রক্ষার জন্য সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর অবাঙ্গালী সামন্ত মু সুদ্দিদের সাথে বাঙ্গালী সামন্ত মু সুদ্দিদের দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে উগ্রজাতীয়তাবাদী জোয়ারের সৃষ্টি করা হলে কমরেড দ্বিজেন সোম ও তাঁর পার্টি এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নকে সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধী বৃহত্তর সংগ্রামের অংশ ও অধীনস্থ হিসেবে নির্ধারণ করে সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রদান করেন এবং শ্রমিক কৃষক জনগণের শত্রু সাম্রাজ্যবাদ সামন্তবাদ আমলা মু সুদ্দিপুঁজি বিরোধী জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সংগঠন সংগ্রাম পরিচালনা করেন।

পরবর্তীতে গত শতকের আশির দশকে মাও
সেতুং এর ‘তিনবিশ্ব তত্ত্ব্থকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিতর্ক শুরু হলে মাও সেতুং চিন্তাধারা তথা ‘তিনবিশ্ব তত্ত্ব্থকে সংশোধনবাদী শ্রেণি সমন্বয়ের প্রতিবিপ্লবী তত্ত্ব হিসেবে মূল্যায়ন করে এর বিরুদ্ধে কমরেড আব্দুল হক ও কমরেড অজয় ভট্টাচার্যের সাথে তিনি দৃঢ় ভূমিকা পালন করেন এবং আপোষহীন সংগ্রাম পরিচালনা করেন। চীন, কিউবা, উত্তর কোরিয়াকে কেন্দ্র করে প্রবাহমান সংশোধনবাদী
ধারার বিরুদ্ধে তিনি অবস্থান গ্রহণ করেন। কমরেড দ্বিজেন সোম অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি সিলেট জেলা কমিটি এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) সিলেট জেলা কমিটির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলে জানা যায়। শৈশবে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের আত্মত্যাগ ওমানুষের প্রতি দরদ দেখে কমরেড দ্বিজেন সোম কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন এবং পার্টির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে পার্টির সার্বক্ষণিক সভ্য হিসেবে আত্মনিয়োগ করেন।

জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে কাজ করে গেছেন। সিলেট অঞ্চলের অনেক রাজনীতিবিদের রাজনৈতিক শিক্ষাগুরু ছিলেন কমরেড দ্বিজেন সোম। তিনি ছিলেন অকৃতদার এবং সকলের কাছে দেলোয়ার ভাই হিসেবে অধিক পরিচিত ছিলেন।

কমরেড দ্বিজেন সোম এর ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী আমরা এমন এক সময়ে পালন করছি, যখন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত, দ্বন্দ্ব-সংঘাত; সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ-বিগ্রহ, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি ও উত্তেজনা; শ্রমিকশ্রেণি ও জনগণের আন্দোলন-সংগ্রাম, বিদ্রোহ-বিপ্লব; করোনা পরিস্থিতিসহ নানান রকমের ঘটনা প্রবাহে এগিয়ে চলছে। ত্রিশের দশকের মহামন্দা ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে ২০০৮ সালে সূচিত এ
পর্যায়ের বৈশ্বিক মন্দাকে করোনা মহামারী ত্বরান্বিত করে পঁচাত্তর বছরের বৃহত্তম মন্দায় পরিণত করেছে।

করোনা মহামারী বিদ্যমান পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় স্বাস্থ্যখাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংকট
মোকাবেলায় তার অক্ষমতা ও অকার্যকারিতা নগ্নভাবে উন্মোচিত করে। সাম্রাজ্যবাদী একচেটিয়া পুঁজির সর্বোচ্চ মুনাফার লক্ষ্যে পরিচালিত এ সকল খাতসহ গোটা ব্যবস্থার গণবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র ও দেউলিয়াত্ব উন্মোচন করে। বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার কারণে কোটি কোটি মানুষের আক্রান্ত হওয়া ও লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু; করোনা সংক্রমণ মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সামগ্রীর অপ্রতুলতা; ডাক্তার-নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ ‘সম্মুখযোদ্ধা্থদের নিরাপত্তাহীনতা; প্রয়োজনীয় চিকি সা সেবা না
পাওয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।

সাম্রাজ্যবাদ ও তার বিশ্বসংস্থার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকার জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে অপরিকল্পিত, অনিশ্চিত, স্ববিরোধী জনদুর্ভোগের লকডাউন। খাদ্য-পানীয়, আশ্রয়, চিকি সা, ঔষধ-পণ্যের ব্যবস্থা না করে লকডাউন দিয়ে মানুষকে অবরুদ্ধ এবং গৃহবন্দী করার ফলে সাধারণ খেটে খাওয়া শ্রমজীবী নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর নেমে এসেছে মহাদুর্ভোগ। মানুষের মৃত্যু, চাকরি হারানো, কর্মহীনতা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অভাব- অনটন, গরিব আরো গরিব হওয়া, এক শ্রেণির ধনিক গোষ্ঠীর আরো ধনী হওয়া- এসব কিছুর জন্য দায়ী যে বিদ্যমান শোষণমূলক সমাজব্যবস্থা একথা আজ দিবালোকের মত পরিষ্কার। বিভিন্ন সংস্থার গবেষণায় উঠে এসেছে করোনার কারণে গত এক বছরে দেশে আড়াই কোটি মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন এবং ৪২ শতাংশ শ্রমিকের আয় আগের তুলনায় কমেছে। সরকার কর্মহীন শ্রমজীবী জনগণের জীবন ও জীবিকা রক্ষার পরিবর্তে
ব্যাটারি চালিত রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক, নসিমন-করিমন-ভটভটি-আলমসাধু উচ্ছেদের ঘোষণা দিয়েছে। সরকারের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্তের কারণে এখাতের উপর নির্ভর লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী জনগণের জীবনধারণ হুমকির মুখে পড়েছে।

করোনা মহামারীতে জনগণের জীবন ও জীবিকা সংকটে পড়লেও লুটপাটকারীদের অর্থবিত্ত
বৈভব বেড়ে যাওয়ায় গত এক বছরে দেশে ১০ হাজার ৫১ জন নতুন কোটিপতির সৃষ্টি হয়েছে।
সরকার শ্রেণিস্বার্থে এর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করে গরিব মানুয়ের উপর খড়গহস্ত হয়েছে।
ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী ও পাকাপোক্ত করে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস অব্যাহত রেখে শ্রমিক, কৃষক, জনগণের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং বিপ্লবী শক্তিকে ধ্বংস করা এবং প্রতিক্রিয়াশীল প্রতিপক্ষকে কোনঠাসা করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস তীব্রতর করে চলেছে। করোনা পরিস্থিতি মোকবেলার কথা বলে ঘোষিত উদ্দীপক কর্মসূচির মাধ্যমে মূলত দালাল পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করে। শ্রমিক-কৃষক-জনগণের অভাব-অনটন, বেকারত্ব ইত্যাদি বৃদ্ধি পেয়ে জীবন-জীবিকা আরো কঠিন হয়ে পড়া সত্ত্বেও ত্রাণ নিয়ে চালায় বেপরোয়া লুটপাট। বাজার অর্থনীতির অজুহাত তুলে ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধি
নিয়ন্ত্রণ না করে সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনায় শোষণ-লুন্ঠনের পথ প্রশস্ত করে চলেছে সরকার।

বৈশ্বিক মহামারী করোনার ভয়াবহতায় বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণি ও জনগণের বেঁচে থাকা চ্যালেঞ্জ হলেও ভ্যাকসিন, ঔষধ, পেটেন্ট নিয়ে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা নগ্নভাবে প্রতিফলিত হয়ে চলেছে। এক্ষেত্রে মার্কিনের
নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদীরা দালাল ভারতকে স্বীয় লক্ষ্যে প্রতিপক্ষ বৃহ সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্যে
অগ্রসরমান পুঁজিবাদী চীনের বিরুদ্ধে কাজে লাগায়। এর প্রতিফলন ঘটে বাংলাদেশে ভ্যাকসিন নিয়ে
প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে। শুধু ভ্যাকসিন নয়, বরং সামগ্রিক ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরকে কেন্দ্র করে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একক পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এতদ্বাঞ্চলের প্রধান আঞ্চলিক শক্তি নয়াউপনিবেশিক ভারতকে চীনের পাল্টা ভারসাম্য হিসাবে কাজে লাগাচ্ছে।

ক্রমাবনতিশীল একক পরাশক্তি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার অবস্থান ধরে রাখতে প্রতিপক্ষ চীন ও
সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়াকে মোকাবেলায় ওবামা আমলের এশিয়া-প্যাসিফিক রণনীতির ধারাবাহিকতায় ট্রাম্প আমলে দুই মহাসাগরে নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব ধরে রাখার জন্য সামনে আনে ইন্দো-প্যাসিফিক রণনীতি (আইপিএস)। দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তি ও ফাইভ-জি (৫এ)সহ প্রযুক্তিগত অগ্রসরতা মোকাবেলায় মার্কিন নেতৃত্বে জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতকে নিয়ে কোয়াড প্রক্রিয়াকে অগ্রসর করে। মার্কিন
সাম্রাজ্যবাদ নয়াঔপনিবেশিক-আধাসামন্তবাদী ভারতকে চীনের পাল্টা-ভারসাম্য (ঈড়ঁহঃবৎ ইধষধহপব) হিসেবে অগ্রসর করছে। এ প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সাথে লেমোয়া চুক্তির ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ বেকা (ইঊঈঅ)
চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই রণনীতি কার্যকরী করতে মার্কিন নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদী জাপান ও অস্ট্রেলিয়া এবং নয়াউপনিবেশিক ভরতকে নিয়ে কার্যকরী করা হয় চতুষ্টয় (কোয়াড)। মার্কিন নেতৃত্বে জাপান ও ভারতকে নিয়ে মালাবার সামরিক মহড়ায় এবার অষ্ট্রেলিয়াকে যুক্ত করা হয়।

পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার অতিউ পাদন সংকট থেকে সৃষ্ট চলমান মন্দা পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পেতে বিশ্ববাজার ও প্রভাব বলয় পুনর্বন্টনকে কেন্দ্র করে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্ব-সংঘাত, বাণিজ্যযুদ্ধ,মুদ্রাযুদ্ধ, আঞ্চলিকযুদ্ধ বিস্তৃত হয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিপদের দিকে পৃথিবীকে ঠেলে দিচ্ছে। একই সাথে প্রতিপক্ষকে মোকাবেলায় স্ব স্ব যুদ্ধ প্রস্তুতিতে ও সমরনীতিকে অগ্রসর করতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামরিক তথা সামগ্রিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে যুদ্ধ প্রস্তুতি প্রক্রিয়াকে অগ্রসর করছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থল-সংযোগ সেতু এবং প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরের সংযোগকারী মালাক্কা প্রণালী সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরীয় দেশ হিসাবে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও রণনীতিগত গুরুত্বের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে নিয়ে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বরে তীব্রতা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় ‘কোয়াড্থ প্রশ্নে নগ্ন রূপে সামনে আসে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এতদ্বঞ্চলে তার প্রাধান্য ধরে রাখতে বাংলাদেশের সাথে বিভিন্ন চুক্তির ধারাবাহিকতায় ইন্দো-প্যাসিফিক রণনীতিতে বাংলাদেশকে যুক্ত করার ত পরতা গুরুত্বপূর্ণ।

নয়াউপনিবেশিক-আধাসামন্তবাদী বাংলাদেশে মার্কিনের নিয়ন্ত্রণ ও প্রাধান্য থাকলেও পুঁজিবাদী চীনের অবস্থান, নিয়ন্ত্রণ ও প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা সর্বাত্মক রূপে অগ্রসর হচ্ছে।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশে পুঁজি বিনিয়োগে এগিয়ে থাকা, বিআরআই-এ সম্পৃক্ত থাকা, বাংলাদেশ-চীনের
অংশিদারিত্বমূলক সম্পর্ক, বাংলাদেশের প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ ইত্যাদি ক্ষেত্রে চীন এগিয়ে থাকায়
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বাংলাদেশকে ইন্দো-প্যাসিফিক রণনীতিতে যুক্ত করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এ
প্রেক্ষিতে ট্রাম্প আমলের শেষ সময়ে ১৪ অক্টোবর্থ২০ মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগ্যানের
বাংলাদেশ সফর এবং ইন্দো-প্যাসিফিক রণনীতিতে যুক্ত করার ত পরতার ধারাবাহিকতায় জো বাইডেন আমলে
প্রেসিডেন্টের জলবায়ু বিষয়ক বিশেষ দূত জন কেরি ৯ এপ্রিল বাংলাদেশে সফর তা পর্যপূর্ণ। ২৬ মার্চ ভারতের
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বাংলাদেশ সফর এবং এপ্রিল মাসে ভারতের সেনা প্রধানের বাংলাদেশ সফর
গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রেক্ষাপটে ২৭ এপ্রিল চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর এবং পরবর্তীতে ১০ মে চীনা
রাষ্ট্রদূত কূটনৈতিক সাংবাদিকদের সাথে ভার্চুয়াল মতবিনিময়কালে বাংলাদেশ ‘কোয়োড্থ-এ যুক্ত হওয়ার বিষয়ে
বাংলাদেশকে সর্তকবার্তা দেন।
চীনের বিআরআই ও মার্কিনের কোয়াড প্রশ্নে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আমলা-মু সুদ্দি পুঁজিপতি
শ্রেণি ও তাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভিন্ন পরিবর্তনের দিক সামনে আসছে। একই সাথে চীনা
সংশোধনবাদীরাও ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার লক্ষ্যে ষড়যন্ত্র-চক্রান্তমূলক ভূমিকা আরও বৃদ্ধি করে চলেছে।
এরা শ্রমিক-কৃষক-জনগণের সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, আমলা-মু সুদ্দি পুঁজি বিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামকে
বিভ্রান্ত, বিভক্ত ও বিপথগামী করার অপত পরতায় লিপ্ত। নয়াউপনিবেশিক আধাসামন্ততান্ত্রিক বাংলাদেশের
ক্ষমতাসীন সরকার ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব কারো সাথে শত্রুতা নয়্থ-এর নামে তার সাম্রাজ্যবাদের দালালির
চরিত্র আড়াল করার অপকৌশল গ্রহণ করে চলেছে। বাংলাদেশ মার্কিন পরিকল্পনায় সৌদি আরবের নেতৃত্বে
৩৪টি সুন্নী প্রধান ইসলামিক দেশের সামরিক জোটে সম্পৃক্ত থাকা তার একটি উদাহরণ।
বিশ্বব্যাপী ফিলিস্তিন সমস্যা, কাশ্মির, রোহিঙ্গা জাতিসত্ত্বাসহ বিভিন্ন জাতিসত্ত্বার ওপর জাতিগত নিপীড়ন,
হত্যাযজ্ঞ, উগ্র যুদ্ধ উন্মদনা, সীমান্ত বিরোধ, সংঘাত-উত্তেজনা, উগ্রজাতীয়তাবাদ, উগ্রসাম্প্রদায়িকতার
উ স হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শক্তিকে সকল সাম্রাজ্যবাদী অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে
দাঁড়িয়ে যুদ্ধসহ সকল ধরনের শোষণ-নিপীড়নের জন্য দায়ী পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনের
সংগ্রামের অংশ হিসাবে এদেশের শ্রমিক-কৃষক-জনগণকে সকল সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালাল এবং তাদের
স্বার্থরক্ষাকারী স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন-সংগ্রামের পথে অগ্রসর হতে হবে।
কমরেড দ্বিজেন সোম এর দীর্ঘ ৬৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনে প্রায় ৪০ বছর তাঁকে আত্মগোপনে থেকে
রাজনৈতিক ত পরতা চালাতে হয়। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা প্রতিকূলতা সত্বেও মার্কসবাদ লেনিনবাদ
এর লাল পতাকাকে সমুন্নত রাখেন এবং সকল রূপের সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রাম পরিচালনা
করেন। আমাদের মতো নয়াউপনিবেশিক ও আধাসামন্তবাদী দেশে জাতীয় জীবনের দূর্দশা ও সংকটের মূল কারণ
সাম্রাজ্যবাদ ও দালালদের নির্মম শোষণ নির্যাতন। আর এই শোষণ নির্যাতন থেকে মুক্তির একমাত্র পথ
শোষণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার উচ্ছেদ এবং যা শ্রমিক কৃষক জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে
আসতে পারে। এই ছিল তাঁর প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকার। এ লক্ষ্যে সমগ্র জীবন তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে লড়ে গেছেন
তাঁর আদর্শ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে। সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদই মানব মুক্তির একমাত্র পথ- এই ছিল তাঁর দর্শন।
লেখক: সভাপতি, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট, সিলেট জেলা শাখা।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়াার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.