আওয়ামী খোলস বদলে সিলেট নগরীতে অপরাধের অদৃশ্য সাম্রাজ্য সহোদর দুই ডেভিল নেতার
সিলেটপোস্ট ডেস্ক
প্রকাশিত হয়েছে : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ২:৩৬ পূর্বাহ্ণ
পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা যখন কারাগার, আত্মগোপন কিংবা দেশান্তরী ঠিক তখনই সিলেট মহানগরীতে এক ভিন্ন বাস্তবতা দৃশ্যমান। অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগের দুই সহোদর নেতা রাজনৈতিক খোলস পাল্টে নতুন পরিচয়ে আবারও নগরীর আইন, প্রশাসন ও অপরাধ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছেন।
নগরবাসীর প্রশ্ন—যেখানে সারাদেশে আওয়ামী ডেভিলদের পতন, সেখানে সিলেটে তারা এতটাই অপ্রতিরোধ্য কেন?
একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, সিলেটের কোতোয়ালি থানা এখন কার্যত এই দুই ভাইয়ের প্রভাববলয়ের কেন্দ্র। দিনের অধিকাংশ সময় থানাপ্রাঙ্গণে অবস্থান করে তারা পুলিশের একটি অংশকে ব্যবহার করে চালাচ্ছেন—
আইন বাণিজ্য, তদবির বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও মামলাবাণিজ্য, টেন্ডার সিন্ডিকেট, জবরদখল ও ভূমি দখল অপারেশন।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, নিরীহ মানুষকে একের পর এক মামলায় জড়িয়ে ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হচ্ছে। টাকা না দিলে মামলা, হামলা কিংবা ‘ক্রসফায়ার’ আতঙ্ক—সবই ব্যবহার হচ্ছে অস্ত্র হিসেবে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করেও তারা নির্বিঘ্নে চলাফেরা করছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে প্রকাশ্য হুমকি দিলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। এতে নগরজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ভয় ও আতঙ্কের সংস্কৃতি।
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্র জানায়, বিগত দিনে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী মন্ত্রী শফিকুর রহমানের ঘনিষ্ঠ আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় অস্ত্রবাজি থেকে দখলবাজি—সবকিছুই ছিল এই দুই ভাইয়ের নিত্যদিনের কাজ। সরকার পতনের পরও সেই নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন—এনামুল হক খুর্শেদ, সিলেট মহানগর তাঁতী লীগের ত্রাণ-পুনর্বাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক। ২০১৬ সালে স্বৈরশাসনের মধ্যেই আওয়ামী লীগের সদস্যপদ নবায়ন করে নিজ অবস্থান পাকাপোক্ত করেন। তার সহোদর ফজলুল হক মোর্শেদ, বাংলাদেশ স্বেচ্ছাসেবক লীগ সিলেট মহানগর শাখার সহ-সভাপতি। অভিযোগ অনুযায়ী, এই দুই ভাই আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে আজও সিলেট মহানগরীর অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করছেন—যা কার্যত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য অশনিসংকেত।
সবচেয়ে বিস্ময়কর অভিযোগ—স্থানীয় বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একটি অংশ নীরব সমঝোতায় এই চক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। আদর্শ নয়, বরং স্বার্থই এখানে রাজনীতির একমাত্র চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য জানতে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কোতোয়ালি থানা কিংবা সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকেও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
প্রশ্ন হচ্ছে—সিলেট কি এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অধীনে, নাকি থানাকেন্দ্রিক এক অদৃশ্য অপরাধ সাম্রাজ্যের জিম্মায়?
সচেতন নাগরিক সমাজ বলছে, অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নিলে সিলেট নগরী এক ভয়ংকর দৃষ্টান্তে পরিণত হবে।
উল্লেখ্য বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে সিলেট মহানগরীর বন্দরবাজার, জিন্দাবাজার, জল্লারপার ও দাড়িয়াপাড়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং মামলা বাণিজ্যের অভিযোগে আলোচনায় রয়েছিলেন আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের এই দুই নেতা—এনামুল হক খুর্শেদ ও ফজলুল হক মুর্শেদ। স্থানীয়দের দাবি, আপন দুই ভাই হিসেবে পরিচিত এই দুই নেতা এলাকায় একপ্রকার ভয়ের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, খুর্শেদ সিলেট মহানগর তাঁতীলীগের ত্রাণ, পুনর্বাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক এবং মুর্শেদ মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি পদে থাকাকালে রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অবৈধ কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
এলাকাজুড়ে চাঁদাবাজি ও মাদক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, বন্দরবাজার ও জিন্দাবাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হতো। কেউ প্রতিবাদ করলে তার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার হুমকি কিংবা সরাসরি হয়রানির শিকার হতে হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
একাধিক এলাকাবাসী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“ওদের কথার বাইরে কেউ গেলে টিকতে পারতো না। দোকান চালাতে হলে মাসোহারা দিতে হতো।”
এছাড়া দাড়িয়াপাড়া ও জল্লারপার এলাকায় মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে তাদের প্রভাব ছিল বলেও অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দাবি, ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রায় ঘোষণার দিন সিলেট আদালত প্রাঙ্গণে সংঘটিত সহিংস ঘটনায় খুর্শেদ ও মুর্শেদের নাম উঠে আসে।
সেদিন আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা পিযুষের নেতৃত্বে সংঘটিত হামলায় এই দুই সহোদী বিএনপির বহু নেতাকর্মী আহত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই ঘটনায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে খুর্শেদ ও মুর্শেদ সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও প্রকাশ্যে চলাফেরা
রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ও সরকার পতনের পরও তারা আরো কৌশলগত ভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, আর এর নেপথ্যে রয়েছে নেশাগ্রস্থ সুবিধাভোগী জনৈক ছাত্র নামধারী ব্যাক্তির একক অধিপত্যে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের নাম ভাঙ্গিয়ে নিজেকে নেতাদাবী করে প্রশাসন সহ সর্ব ক্ষেত্রে ফায়দা হাসিল করা। তারই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে অভিযুক্ত দুই ব্যক্তি প্রকাশ্যে সিলেট নগরী ও বন্দর এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।




