সিলেট সীমান্তে বিস্ফোরকের রহস্যজনক প্রবেশ: নাশকতার আশঙ্কা
সিলেটপোস্ট ডেস্ক
প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৪:৩২ অপরাহ্ণ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে ততই বাড়ছে উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা। একাধিক অস্ত্রের চালান ধরা পড়ার পর পরই বদলে যায় দৃশ্যপট। আগ্নেয়াস্ত্রের বদলে এবার সিলেটের একাধিক সীমান্তের চোরাই পথ দিয়ে ঢুকছে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বিস্ফোরক।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এই পর্যন্ত যতগুলো আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছিলো সবকটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেলেও নেপথ্যের কারিগররা সবসময়ই অধরা থেকে গেছে। এবার একাধিক বিস্ফোরকের চালান ধরা পড়লেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাহিরে। সীমান্ত পথ পাড়ি দিয়ে কিছু কিছু চালান ধরা পড়লেও বড় অংশই থেকে যাচ্ছে নাগালের বাইরে। এ অবস্থায় জাতীয় নির্বাচন ঘিরে বিশৃঙ্খলার শঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
এ পর্যন্ত যতগুলো পাওয়ার জেল ও ডেটোনেটর উদ্ধার করা হয়েছে সবকটি চালান আসে ভারত থেকে। এই দুটো মিলে হয় ‘উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক’। কখনো কখনো পাকা দালানও উড়িয়ে দিতে পারে। এগুলো সাধারণত ব্যবহার হয় সিলেটের ওপারে মেঘালয়ের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায়। শব্দ শুনেন বাংলাদেশের মানুষও। পাথরের পাহাড় ভাঙায় কাজ করে এই বিস্ফোরক। প্রশ্ন উঠেছে কারা ঢুকাচ্ছে এই চালান।
চোরাচালানের সঙ্গেই সিলেট সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে বিস্ফোরকের চালান। সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।
পুলিশ সূত্র জানায়, সিলেটের সীমান্তবর্তী জেলায় বিভিন্ন সময়ে যেসব ব্যক্তি অবৈধভাবে লোকজন পারাপারসহ চোরাচালানি করে তাদের একটি তালিকা তৈরি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশের ভাষায় এদের লাইনম্যান বলা হয়। এই তালিকায় সিলেটের সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী লাইনম্যানদের নাম-ঠিকানা রয়েছে, যারা ইতোমধ্যে অপরাধে জড়িয়ে জেল খেটেছেন। তাদের অবস্থান শনাক্ত করার পাশাপাশি তাদের গতিবিধি নজরদারিতে রাখার জন্য পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে। এসব তালিকা জেলা পুলিশ সুপারদের কাছে পাঠানো হয়েছে। তালিকা পাঠানোর পাশাপাশি দেয়া হয়েছে গ্রেফতারের নির্দেশনাও।
সূত্রে জানা যায়, সর্শেষ সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) মধ্যরাতে বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের তারাদরম এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় এসব বিস্ফোরক ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ সময় বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে দুষ্কৃতিকারীরা পালিয়ে যায়। উদ্ধারকৃত বিস্ফোরক ও অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে- ২৪টি পাওয়ারজেল নাইনটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন (ভারতের এসবিএল এনার্জি লিমিটেড, নাগপুরে প্রস্তুতকৃত) বিস্ফোরক, ২৩টি ডিটোনেটর, ১৫ মিটার ডিটোনেটর কর্ড এবং ৩ টি পাইপ গান। উদ্ধার হওয়া পাওয়ারজেল নাইনটি উচ্চ বিস্ফোরক (ভারতের এসবিএল এনার্জি লিমিটেড, নাগপুরে প্রস্তুত) লেখা রয়েছে।
এছাড়া শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে দক্ষিণ সুরমার জৈনপুর শিববাড়ি এলাকায় রেলওয়ের পুরাতন টয়লেটের ভেতর থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় বিস্ফোরকগুলো উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত বিস্ফোরকের মধ্যে রয়েছে ভারতীয় ৬টি পাওয়ার জেল ও ৫টি নন ইলেকট্রিক ডেটোনেটর।
এছাড়া সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার দিঘিরপাড় ইউনিয়নের কুওরেরমাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত একটি ভবনের ভিতর থেকে ২৫টি পাওয়ার জেল ও ২৭টি ইলেকট্রিক ডেটোনেটর উদ্ধার করা হয়। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গোয়াইনঘাটের পশ্চিম আলীরগাঁও ইউনিয়নের সাতাইন এলাকায় বন বিভাগের পরিত্যক্ত একটি ভবনের অব্যবহৃত সেপটিক ট্যাংকের ভিতর থেকে ৮টি পাওয়ার জেল ও ৮টি নন ইলেকট্রিক ডেটোনেটর উদ্ধার করে র্যাব। বুধবার রাতে তাহিরপুর উপজেলার উত্তর বড়দল এলাকার বারেকেরটিলা ওয়াচ টাওয়ারের দক্ষিণ পাশে অভিযান চালিয়ে র্যাব ১.১২৫ কেজি পাওয়ার জেল, ৬টি ইলেকট্রিক ও ১০টি নন ইলেকট্রিক ডেটোনেটর উদ্ধার করে। গত ২৩ জানুয়ারি দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ী এলাকায় রেলওয়ের পুরাতন টয়লেটের ভিতর থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ৬টি পাওয়ার জেল ও ৫টি নন ইলেকট্রিক ডেটোনেটর উদ্ধার করে র্যাব। তবে এসব বিস্ফোরকের চালানের সঙ্গে জড়িত কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
এছাড়া শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) দিবাগত রাত সাড়ে ১১টার দিকে মহানগরের টিলাগড় কালাশীল এলাকার মৃত আবদুল মালিকের মালিকানাধীন ‘জাহাজ বিল্ডিং’ নামীয় ভবনের তৃতীয় তলার ৩০৪ নম্বর ইউনিটের একটি পরিত্যক্ত রুম থেকে লাল ও কালো রঙের স্কচটেপ দিয়ে মোড়ানো ১১টি ককটেল সদৃশ্য বস্তু, পুলিশের নামে বরাদ্ধকৃত ৬টি সাদা রঙের রাবার বল এবং সবুজ ও লাল রঙের ১১টি লিডবল কার্তুজ, তারযুক্ত ৪টি এলইডি লাইট, ২টি ইলেকট্রিক রেসিস্ট্যান্ট, লাল রঙের বারুদযুক্ত সলতে ২টি, আতশবাজির বারুদযুক্ত ১০টি স্টিক ও ইয়াবা সেবনে ব্যবহৃত ফয়েল পেপার উদ্ধার করা হয়।
এ বিষয়ে বিয়ানীবাজার ৫২-বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আতাউর রহমান সুজন বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সীমান্ত এলাকায় যেকোনো ধরনের নাশকতা, সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও অবৈধ অস্ত্র প্রবেশ রোধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। একই সাথে গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে র্যাব-৯-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ জানান, পাওয়ার জেল ও ডেটোনেটরগুলো উচ্চমাত্রার শক্তিশালী বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। নাশকতার কাজে ব্যবহারের জন্য অপরাধী চক্র এগুলো নিয়ে আসতে পারে। বিস্ফোরক চোরাচালানে জড়িতদের চিহ্নিত করতে র্যাবের তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। একই সাথে গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।



