জালিয়াত চক্রের মাস্টারমাইন্ড সিসিক’র তানভীর-মনসুফ: কোটি টাকার দুর্নীতি ও ৩ প্রজন্মের সিন্ডিকেট
সিলেটপোস্ট ডেস্ক
প্রকাশিত হয়েছে : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ৭:৪১ অপরাহ্ণ
সিলেট সিটি করপোরেশনে (সিসিক) জালিয়াতি, জালিয়াতির মাধ্যমে জালিয়াতি দলিল তৈরি এবং নানামুখী প্রশাসনিক ও আর্থিক দুর্নীতির এক অভূতপূর্ব চাঞ্চল্যকর সাম্রাজ্য গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে সিসিকের প্রধান হিসাব রক্ষক আ ন ম মনসুফ এবং তার ছেলে সহকারী প্রকৌশলী মোহতাসিম আহমেদ তানভীরের বিরুদ্ধে। শুধু অফিসের ভেতরের ফাইলপত্রে হেরফের করেই ক্ষান্ত হননি তারা, বরং নিজেদের বাসাতেই বানিয়ে তুলেছিলেন একটি পূর্ণাঙ্গ ‘জালিয়াতির কারখানা’। সিসিকের শীর্ষস্থানীয় ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভুয়া সিল ও নকল স্বাক্ষর ব্যবহার করে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করার তথ্য, নথিপত্র এবং একাধিক ফাঁসম হওয়া বিস্ফোরক অডিও কল রেকর্ড এখন প্রশাসনের হাতে।
বেডরুমে জালিয়াতির মূল কেন্দ্র ও স্ত্রীর সক্রিয় ভূমিকা অনুসন্ধানে প্রকাশ পেয়েছে চাঞ্চল্যকর তথ্য—সহকারী প্রকৌশলী তানভীর তার নিজস্ব বাসভবনের বেডরুমকেই বানিয়েছিলেন জালিয়াতি ও জালিয়াতি দলিল তৈরির মূল অফিস। সিলেট নগরীর ঐতিহ্যবাহী সুরমা মার্কেট থেকে সংগৃহীত ভুয়া সিলের মাধ্যমে তিনি ও তার চক্র পরিচালনা করতেন এই কর্মকাণ্ড। সুরমা মার্কেট থেকে সিসিকের সাবেক মেয়র ও বর্তমান প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সচিব, প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং নির্বাহী প্রকৌশলীসহ প্রায় প্রতিটি শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তার নকল সিল তৈরি করে আনা হয়। পরবর্তীতে তানভীরের বেডরুমে বসেই একের পর এক ইমারত ও বিল্ডিং নির্মাণের ফাইল অনুমোদন দেওয়া হতো। এই পুরো জালিয়াতি প্রক্রিয়ায় তানভীরকে সরাসরি ও সক্রিয়ভাবে সহায়তা করতেন তার স্ত্রী তান্নী। নথিপত্রের বিশ্লেষণ এবং সিসিক সূত্রে জানা যায়, মেয়রসহ অন্যান্য সকল কর্মকর্তার স্বাক্ষর হুবহু নকল (জাল) করার মূল দায়িত্বটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সম্পাদন করতেন তান্নী নিজেই। সিসিকের অনুমোদিত ইমারত নকশা, ব্যাংকের ভুয়া জমা চালান (ব্যাংক পে-অর্ডার/চালান) এবং সরকারি বিভিন্ন নথিপত্রে ভুয়া স্বাক্ষর ও সিল বসিয়ে স্বামী-স্ত্রী যৌথভাবে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। সম্প্রতি জালিয়াতির এসব প্রমাণ এবং অডিও রেকর্ডিং বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ্যে চলে আসলে, ঘটনা ধামাচাপা দিতে এবং আইনি পদক্ষেপ থেকে বাঁচতে সিসিক প্রশাসনকে না জানিয়েই গোপনে ছুটি না নিয়ে সপরিবারে বিদেশে পাড়ি জমান তানভীর ও তার স্ত্রী।
ক্ষমতার নেপথ্য কারিগর বাবা মনসুফ ও শত কোটি টাকার সম্পত্তি
ছেলে তানভীর বিদেশে চম্পট দিলেও এই বিশাল সিন্ডিকেটের পেছনে মূল মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করছেন তানভীরের বাবা ও সিসিকের প্রধান হিসাব রক্ষক আ ন ম মনসুফ। মনসুফের আদি নিবাস সিলেট জেলার কানাইঘাট উপজেলায় হলেও, দীর্ঘ দিন ধরে নগর ভবনে একক আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তার করে আসছেন তিনি।
সিসিক সূত্রে জানা গেছে, মনসুফ সিসিকের একজন দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারী হলেও তিনি নিয়মিত ব্যবহার করেন সিসিকের বরাদ্দকৃত বিলাসবহুল জিপ গাড়ি। আইন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চোখ ফাঁকি দেওয়া এবং কৌশলগতভাবে নিজেদের নির্দোষ দেখানোর উদ্দেশ্যে তিনি মাত্র ১ টাকা ভাড়ায় সিসিকের নিজস্ব জমিতে বসবাস করে আসছেন।
অথচ বাস্তবে সিলেট শহরের আনাচে-কানাচে মনসুফ ও তার পরিবারের অঢেল ও চোখ কপালে তোলার মতো সম্পদ রয়েছে:
মার্কেটের দোকান: সিলেট নগরীর প্রতিটি বড় এবং অভিজাত বাণিজ্যিক মার্কেটে মনসুফ পরিবারের নামে অন্তত তিনটি করে বাণিজ্যিক দোকান কোঠা রয়েছে।
আবাসিক সম্পত্তি: সিলেট শহরের বিভিন্ন নামিদামি আবাসিক এলাকায় তাদের নামে রয়েছে একাধিক বহুতল বাড়ি, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং একাধিক দামি ব্যক্তিগত গাড়ি।
দাবি: মনসুফ নিজেও বিভিন্ন মহলে ও সহকর্মীদের কাছে প্রকাশ্যে দাপিয়ে বলে বেড়ান যে, তিনি শত কোটি টাকার মালিক।
এছাড়া সিসিকের বিভিন্ন বিলের স্লিপ জালিয়াতি, কেনাকাটার ভুয়া ভাউচার তৈরি, অবৈধ নিয়োগ বাণিজ্য এবং সিসিকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অজান্তে সিটি করপোরেশনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে বেনামে কোটি কোটি টাকা উত্তোলনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগও রয়েছে মনসুফের বিরুদ্ধে।
অসহায় কর্মচারীদের সঙ্গে প্রতারণা ও হাইকোর্টের ভুয়া অজুহাত মনসুফ-তানভীর সিন্ডিকেটের জালিয়াতির থাবা থেকে ছাড় পায়নি সিসিকের নিম্নআয়ের অসহায় কর্মচারীরাও। সিসিকে কর্মরত প্রায় ২৫৮ জন অস্থায়ী কর্মচারীকে স্থায়ী করার লোভ দেখিয়ে এক বড় ধরনের প্রতারণা চালায় এই চক্র।
হাইকোর্টে মামলা পরিচালনার খরচ ও স্থায়ী করার প্রসেসিং ফির অজুহাত দিয়ে সিসিকের এই ২৫৮ জন অস্থায়ী কর্মচারীর কাছ থেকে জনপ্রতি ১০,০০০ টাকা করে নগদ অর্থ আদায় করা হয়। এভাবে কর্মচারীদের কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় মনসুফ ও তার চক্র। তবে বছরের পর বছর পার হলেও এবং কর্মচারীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করা সত্ত্বেও তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি বা কোনো কর্মচারী স্থায়ী পদে নিয়োগ পাননি।
অপরাধের আড়াল ও জনমনে ক্ষোভ..
জালিয়াতি ও আর্থিক আত্মসাতের মাধ্যমে বিশাল সম্পত্তি গড়ে তোলার পর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাত থেকে ছেলেকে বাঁচাতে মনসুফ নিজেই বুদ্ধি এঁটে ছেলে তানভীর ও ছেলের বউকে বিদেশে পাঠিয়ে দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ছেলে ও পুত্রবধূ বিদেশে নিরাপদে অবস্থান করলেও, অপরাধের মূল হোতা বাবা মনসুফ এখনও সিসিকে নিজ পদে বহাল তবিয়তে রয়েছেন এবং নিয়মিত নিজের ক্ষমতা ও প্রতারণা বজায় রেখেছেন। একজন ২য় শ্রেণির পদে থেকে কীভাবে একজন কর্মচারী দীর্ঘ দিন ধরে একই প্রতিষ্ঠানে এমন সীমাহীন দুর্নীতি ও কোটি কোটি টাকার লুটপাট চালিয়ে যেতে পারেন, তা নিয়ে সিলেটের সাধারণ নাগরিক ও সচেতন মহলের



