কৃষক কার্ড: মাঠের মানুষের হাতে মর্যাদার নতুন ঠিকানা
এ এম ইমদাদুল ইসলাম
প্রকাশিত হয়েছে : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭:৫৯ অপরাহ্ণ
তরুণ বয়সে যে হাত লাঙল ধরেছিল, বার্ধক্যেও সেই হাতেই এখন ধরা থাকে একটি প্লাস্টিকের কার্ড। দেখতে সাধারণ, কিন্তু এর ভেতরে জমা আছে এক কৃষকের পরিচয়, তার জমির হিসাব, প্রাপ্য ভর্তুকি এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি। নাম তার ‘কৃষক কার্ড’ (Farmers Card), বাংলাদেশের কৃষিখাতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে কৃষি মন্ত্রণালয় এই কার্ড কর্মসূচি হাতে নেয়। দেশের অর্থনীতিতে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; জনসংখ্যার একটি বড়ো অংশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এসব পেশার সঙ্গে জড়িত। অথচ দীর্ঘদিন ধরে কৃষকেরা ভর্তুকি পেতে মধ্যস্বত্বভোগীর দ্বারস্থ হওয়া, কৃষিঋণ পেতে জটিল প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় উপকরণ ন্যায্যমূল্যে না পাওয়ার মতো নানা সমস্যায় ভুগেছেন। রোদ-বৃষ্টি, খরা-বন্যা ও নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে দেশের মানুষের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা সেই কৃষকের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সেবা সহজলভ্য করাই কৃষক কার্ডের অন্যতম লক্ষ্য। তাই এটি শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়; বরং দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও জটিলতার অবসান ঘটিয়ে কৃষকের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপদ ভবিষ্যতের পথে একটি নতুন আশার নাম।
পয়লা বৈশাখে (১৪ এপ্রিল ২০২৬) টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ের কার্ড বিতরণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির যাত্রা শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে ৮টি বিভাগের কয়েকটি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে কার্যক্রম চালু হয়েছে, ধীরে ধীরে যা সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
শুধু ফসল উৎপাদনকারী কৃষকই নন, বরং ভূমিহীন কৃষক, জমির মালিক কৃষক, বর্গা বা ইজারায় চাষাবাদকারী, মৎস্যচাষি, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির খামারি, দুগ্ধখামারি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে লবণচাষিসহ সরকার ঘোষিত কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত সবাই পর্যায়ক্রমে এই কার্ডের আওতায় আসবেন। নিজের জমি না থাকলেও বর্গা বা ইজারা নিয়ে চাষাবাদ করলে তাকেও কৃষক হিসেবে বিবেচনা করে কৃষক কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। জমির পরিমাণের ভিত্তিতে কৃষকদের পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হচ্ছে: ৫ শতকের কম জমির মালিক ভূমিহীন, ৫ থেকে ৪৯ শতক প্রান্তিক, ৫০ থেকে ২৪৯ শতক ক্ষুদ্র, ২৫০ থেকে ৭৪৯ শতক মাঝারি এবং ৭৫০ শতক বা তার বেশি জমির মালিক বড়ো কৃষক হিসেবে বিবেচিত হবেন। এই শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে কৃষকদের সঠিকভাবে শনাক্ত ও নিবন্ধন করে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
সরকারের লক্ষ্য হলো—কৃষকের জমির মালিকানা, চাষের ধরন বা শ্রেণি যাই হোক না কেন, কৃষিকাজের সঙ্গে প্রকৃতভাবে যুক্ত ব্যক্তিকে একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল পরিচয়ের আওতায় আনা। এর ফলে কৃষকের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি সহায়তা ও বিভিন্ন কৃষিসেবা আরও সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও সহজভাবে প্রকৃত সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে। আগামী চার বছরে প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষকের হাতে এই কার্ড তুলে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার, যার জন্য প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬৮১ কোটি টাকা। প্রি-পাইলট পর্যায়ে ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষককে কৃষি উপকরণ কেনার জন্য জনপ্রতি বছরে ২,৫০০ টাকা প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে, যা দিয়ে নির্ধারিত ডিলারের POS মেশিনের মাধ্যমে সার, বীজ, ফিডসহ নির্ধারিত উপকরণ কেনা যাবে।
কৃষক কার্ড শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়; এটি কৃষকদের জন্য বিভিন্ন সরকারি কৃষিসেবা এক ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসার একটি উদ্যোগ। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে একজন কৃষককে কমপক্ষে ১০ ধরনের কৃষিসেবা দেওয়া হবে। কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করা, উৎপাদন বাড়ানো এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।কৃষক কার্ডের মাধ্যমে যেসব গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকবে, সেগুলো হলো: কৃষকরা নির্ধারিত ব্যবস্থার মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে সার, বীজসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ কেনার সুযোগ পাবেন।কৃষিখাতে সরকারের বিভিন্ন ভর্তুকি ও প্রণোদনা কর্মসূচির সুবিধা কৃষকের কাছে আরও সহজে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।কৃষকদের জন্য সেচের খরচ কমানো এবং ন্যায্যমূল্যে সেচসেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, কম্বাইন হারভেস্টারসহ বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি স্বল্পমূল্যে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার বাড়বে এবং শ্রম ও উৎপাদন খরচ কমবে।
এছাড়াও কৃষকরা সহজ শর্তে ও তুলনামূলক কম সুদে কৃষি ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংকট কমবে।ফসলের পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও বীমা সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্যান্য ঝুঁকিতে কৃষকের ক্ষতি মোকাবিলায় এ সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কৃষকরা যাতে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্য সংরক্ষণ করতে পারেন, সে ধরনের বাজার ও সংরক্ষণসুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। কার্ডধারী কৃষকদের আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি পদ্ধতি, উন্নত জাতের ফসল উৎপাদন, রোগ-বালাই নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কৃষকরা আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং বিভিন্ন কৃষিপণ্যের বাজারদর সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন। ফলে কৃষকরা ফসল উৎপাদন ও বিক্রির ক্ষেত্রে আরও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। মোবাইলের মাধ্যমে ফসলের রোগ-বালাই শনাক্তকরণ এবং তার প্রতিকার সম্পর্কে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ারও ব্যবস্থা থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনাটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন ব্যয় কমানো, কৃষির আধুনিকায়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারি সহায়তা প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছে দিয়ে মধ্যস্বত্বভোগী ও অনিয়ম কমাতেও এই ডিজিটাল ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।
কৃষক কার্ড দোকান থেকে কেনা বা নিজের ইচ্ছামতো তৈরি করা যাবে না। সরকারি প্রক্রিয়ায় তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও অনুমোদনের পরই তা দেওয়া হবে। প্রি-পাইলট ব্যবস্থায় মাঠপর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ করে, উপজেলা কৃষি অফিস তা যাচাই করে এবং উপজেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটি তালিকা অনুমোদন করে,এরপর সোনালী ব্যাংক কার্ড প্রস্তুত ও সক্রিয় করে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও সোনালী ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে তা বিতরণ করা হয়। তাই কার্ড পেতে একজন কৃষকের প্রথম কাজ নিজ এলাকার উপজেলা কৃষি অফিসে গিয়ে তালিকায় নাম আছে কি না এবং তথ্য নিবন্ধিত বা যাচাই হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া। প্রয়োজনে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), জমির তথ্য এবং বর্গা বা ইজারায় চাষাবাদ সংক্রান্ত তথ্য দিতে হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৃষক কার্ড পাওয়ার জন্য কোনো টাকা দিতে হবে না। কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে কেউ টাকা দাবি করলে সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট উপজেলা কৃষি অফিসে বিষয়টি জানাতে হবে। কৃষক কার্ডে ১৪ ডিজিটের একটি ইউনিক কৃষক আইডি থাকবে। এটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকবে এবং কৃষকের কৃষি-সংক্রান্ত তথ্য ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষিত থাকবে। এর ফলে ভবিষ্যতে একজন কৃষককে আলাদা আলাদা জায়গায় গিয়ে বিভিন্ন কাগজপত্র দেখিয়ে ভর্তুকি, ঋণ বা কৃষিসেবা নেওয়ার প্রয়োজন হবে না।শুধু কার্ডটি স্কান করলেই হবে।
সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে কৃষক কার্ড শুধু একটি পরিচয়পত্র হয়ে থাকবে না; এটি হয়ে উঠতে পারে কৃষকের অধিকার, সরকারি সহায়তা ও বিভিন্ন সেবার একটি কার্যকর সেতুবন্ধন। সার-বীজ থেকে শুরু করে ভর্তুকি, ঋণ, বিমা, প্রশিক্ষণ, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও ন্যায্যমূল্যের বাজার,প্রয়োজনীয় সেবা যদি সহজে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে কৃষির উৎপাদনশীলতা যেমন বাড়বে, তেমনি বদলে যাবে লাখো কৃষক পরিবারের জীবন। কৃষকের হাতে যখন প্রযুক্তি ও সরকারি সহায়তার শক্তি একসঙ্গে পৌঁছাবে, তখন মাঠের সবুজ ফসলের সঙ্গে আরও সবুজ হবে কৃষকের স্বপ্ন। কৃষক কার্ড তাই কেবল একটি কার্ড নয়,এটি কৃষকের মর্যাদা, অধিকার ও একটি সমৃদ্ধ কৃষিভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সম্ভাবনাময় হাতিয়ার।
লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, খাদ্য মন্ত্রণালয়
পিআইডি ফিচার



