সিসিকের হিসাবরক্ষক মনছুফ ও ছেলে তানভিরের দুর্নীতি: তদন্ত কমিটি ‘ম্যানেজ’ ও তথ্য ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ
সিলেটপোস্ট ডেস্ক
প্রকাশিত হয়েছে : ২৪ জুলাই ২০২৬, ৬:১১ অপরাহ্ণ
সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) রাজস্ব ও প্রকৌশল শাখায় জালিয়াতি ও দুর্নীতির এক শক্তিশালী জাল উন্মোচিত হয়েছে। জাল রসিদ, ভুয়া ভাউচার ও স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে অন্তত এক কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকিসহ অঢেল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে সিসিকের প্রধান অভিযুক্ত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এই অপকর্মের প্রধান হোতা হিসেবে উঠে এসেছে সিসিকের হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা আ ন ম মনছুফ এবং তাঁর ছেলে পূর্ত শাখার সহকারী প্রকৌশলী মোহতাসিম আহমদ তানভীর (পূর্বে নকশাকার হিসেবে কর্মরত)-এর নাম।
সিসিকের হিসাবরক্ষণ শাখার পদের সুযোগ নিয়ে আ ন ম মনছুফ ভুয়া ভাউচার ও নকল সিল-ছাপ্পড় ব্যবহার করে মোটা অঙ্কের রাজস্ব আত্মসাৎ করতেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে তাঁর ছেলে সহকারী প্রকৌশলী মোহতাসিম আহমদ তানভীর সহ অন্য একদল কর্মচারী বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে জালিয়াতি ও প্রধান প্রকৌশলীর স্বাক্ষর জাল করে ভবনের ভুয়া নকশা অনুমোদনের সাথে সম্পৃক্ত হন। স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া নকশা অনুমোদনের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে তিন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে ওএসডি (সব ধরনের কাজ থেকে বিরত) করা হয়েছে। ওএসডি হওয়া তিন কর্মকর্তা-কর্মচারী হলেন সিসিকের পূর্ত শাখার সহকারী প্রকৌশলী মোহতাসিম আহমদ তানভীর, সহকারী প্রকৌশলী রওসুনা আরা সিদ্দিকা নূপুর এবং প্রকৌশল শাখার ড্রিলিং অ্যাসিস্ট্যান্ট জাহিদ আল হাসান ফাহিম। সিসিক সূত্রে জানা গেছে, ওএসডি হওয়া জাহিদ আল ফাহিম ২০১৯ সালে মামা জুনেলের সুবাদে অস্থায়ী ভিত্তিতে যোগদানের পর জাল রসিদের মাধ্যমে প্রায় কোটি টাকার রাজস্ব লুটপাট করেন। অভিযোগ ফাঁসের পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোহতাসিম আহমদ তানভীর দাবি করেন, ১০-১২টি ফাইল দেখিয়ে তাদের নাম অন্যায়ভাবে জড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে রওসুনা আরা সিদ্দিকা নূপুরও নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, তার উপশহরের বাসায় গিয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি চক্রান্তের শিকার হয়েছেন। আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। এর সব কিছুর মূলে কাজ করছে সিসিকের একটি শক্তিশালী জালিয়াত সিন্ডিকেট।
ঘটনার সার্বিক তদন্তে সিসিক সচিব মো. আশিক নূরকে প্রধান করে সিসিক প্রশাসন উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু থেকেই অভিযুক্ত কর্মকর্তা আ ন ম মনছুফ নিজের অর্থ ও প্রভাব ব্যবহার করে তদন্ত কমিটির সদস্যদের অনৈতিক সুবিধা দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, যাতে তদন্ত প্রতিবেদনে অপরাধের মাত্রা হালকা করা যায় এবং ছেলেকে বড় ধরনের আইনি শাস্তি থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়।
অভিযোগ প্রসঙ্গে তদন্ত কমিটির প্রধান সিসিক সচিব মো. আশিক নূর জানান, তাঁরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন, অভিযুক্ত, সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য নেওয়ার পাশাপাশি সরেজমিনেও তদন্ত করছেন এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই কতৃপক্ষের কাছে নিরপেক্ষ প্রতিবেদন জমা দিতে পারবেন। ইতিমধ্যে তাদের তদন্ত সম্পন্ন হয়ে গেছে। প্রতিবেদনও জমা দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালায়ে।
সিসিক প্রশাসনে সাম্প্রতিক রদবদলের পর এই নথিগুলো নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) বিষয়টি নিয়ে নজর রাখছে। সিসিকের বর্তমান প্রশাসন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তদন্ত কমিটিকে প্রভাবিত করা কিংবা ফাইল ধামাচাপা দেওয়ার যেকোনো চেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করা হবে এবং জালিয়াতি ও রাজস্ব ফাঁকির সাথে যুক্ত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
সিসিকে জালিয়াতি নিয়ে প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, কোন দূর্নীতিবাজকে ছাড় দেওয়া হবেনা। তদন্ত প্রতি বেদনে দূষী প্রমানিত হলেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।




