হজযাত্রার প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি
মোঃ আবুবকর সিদ্দীক
প্রকাশিত হয়েছে : ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৯:৫৫ পূর্বাহ্ণ
ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ হজ। হজ ব্যবস্থাপনা একটি দ্বিরাষ্ট্রীক কার্যক্রম। এই ব্যবস্থাপনার নীতি-নির্ধারণী বিষয়গুলিতে সৌদি সরকারের ভূমিকাই মুখ্য। বাংলাদেশের মতো হজযাত্রী প্রেরণকারী দেশগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সৌদি সরকারের বিধিবিধান, দিকনির্দেশনা ও রোডম্যাপের আলোকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। সৌদি সরকার ঘোষিত হজের রোডম্যাপ অনুসারে আসছে ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশ হতে হজ ফ্লাইট শুরু হয়েছে। আমাদের দেশ হতে সর্বশেষ হজ ফ্লাইটটি ২১ মে ২০২৬ উড়াল দিবে। এবছর চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ২৬ মে পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হতে পারে। এবারের হজ মৌসুমে বাংলাদেশ হতে সর্বমোট ৭৮,৫০০ জন হজ পালন করবেন। ইতোমধ্যে নিবন্ধিত প্রায় শতভাগ হজযাত্রীর ভিসা সম্পন্ন হয়েছে।
এবছর মেডিকেল ফিটনেস ব্যতীত হজে গমন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশেষ করে দুরারোগ্য ব্যাধি যেমন- গুরুতর হৃদরোগ, লিভার সিরোসিস্, ডায়ালাইসিস চলমান এমন কিডনি রোগ, মানসিক রোগ, ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা, যক্ষ্মা এবং থেরাপি গ্রহণকারী ক্যান্সার রোগী প্রভৃতি ব্যক্তিদের হজে গমন কঠোরভাবে নিষেধ করেছে সৌদি সরকার। বার্ধক্যজনিত কারণে চলাচলে অক্ষম বা ডিমেনশিয়ার রোগীদেরও এই তালিকায় রাখা হয়েছে। সৌদি সরকারের পক্ষ হতে সতর্ক করা হয়েছে যে, সৌদি বিমানবন্দরে অবতরণের পরও মেডিকেল ফিটনেসবিহীন কোনো হজযাত্রী চিহ্নিত হলে তাকে বিমানবন্দর হতেই নিজ দেশে ফেরৎ পাঠানো হবে।
বাংলাদেশের কোটায় নিবন্ধিত হজযাত্রীদেরকে অবশ্যই বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী নাগরিক হতে হবে এবং ৩০ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত পাসপোর্টের মেয়াদ থাকতে হবে। বাংলাদেশের কোটায় ভিসা গ্রহণকারী সকল হজযাত্রীকে আবশ্যিকভাবে বাংলাদেশ হতে সৌদি আরবে গমন করতে হবে। হজ ফ্লাইটের পূর্বে ই-হজ সিস্টেম হতে ডাউনলোড করে অথবা হজ এজেন্সির নিকট হতে ভিসা সংগ্রহ করে সঙ্গে রাখতে হবে। হজ ফ্লাইটের দিন ঢাকার হজাযাত্রীদেরকে ফ্লাইটের নির্ধারিত সময়ের কমপক্ষে ৬ ঘন্টা পূর্বে এবং ঢাকার বাইরের হজযাত্রীদেরকে কমপক্ষে একদিন পূর্বে ঢাকার আশকোনা হজক্যাম্পে উপস্থিত থাকতে হবে। হজক্যাম্পের ডরমেটরিতে বিনামূল্যে থাকার বন্দোবস্ত রয়েছে। এছাড়া, ক্যান্টিন হতে নিজ খরচে খাবার গ্রহণেরও ব্যবস্থা রয়েছে হজক্যাম্পে।
একজন হজযাত্রী চেকইন লাগেজ হিসেবে দুটি ট্রলিব্যাগ বা অন্য কোনো ব্যাগ বা কার্টুনে প্রতিটিতে সর্বোচ্চ ২৩ কেজি করে মোট ৪৬ কেজি মালামাল বহন করতে পারবেন। এছাড়া ৭ কেজি ওজনের একটি হ্যান্ড ব্যাগ কেবিন লাগেজ হিসেবে সাথে বহন করা যাবে। চেকইন লাগেজের দৈর্ঘ্য ৬৫ সেমি, প্রস্থ ৪৫ সেমি ও উচ্চতা ২৫ সেমি এবং কেবিন লাগেজের দৈর্ঘ্য ৪৫ সেমি, প্রস্থ ৩৫ সেমি ও উচ্চতা ২০ সেমি হওয়া বাঞ্চনীয়। ট্রলিব্যাগে বা লাগেজে হজযাত্রীর নাম, জাতীয়তা, পাসপোর্ট নম্বর, পিআইডি নম্বর, মোবাইল নম্বর (রোমিং), হজ এজেন্সির নাম ও মোনাজ্জেম বা গাইডের মোবাইল নম্বর ইংরেজিতে লিখতে হবে। এর ফলে লাগেজ হারিয়ে গেলে খুঁজে পাওয়া সহজ হবে। কেবিন লাগেজে একসেট ইহরামের কাপড়, নিত্য প্রয়োজনীয় ঔষধ ও ব্যবহার্য কাপড় রাখতে হবে যাতে চেকইন লাগেজ পেতে দেরি হলেও কোনো সমস্যায় পড়তে না হয়। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের মতো অসুস্থতার জন্য প্রেসক্রিপশনসহ নিয়মিত সেবন করতে হয় কমপক্ষে ৫০ দিনের জন্য এরূপ ঔষধ, স্ট্রিপ ইত্যাদি সঙ্গে নিতে হবে। লাগেজ হারিয়ে গেলে সরাসরি বা এজেন্সির মোয়াল্লেম বা হজ গাইডের মাধ্যমে বাংলাদেশ হজ অফিস জেদ্দা বা মক্কা বা মদিনায় অবহিত করতে হবে। তবে দেশে ফেয়ার পথে লাগেজ হারিয়ে গেলে তা এয়ারপোর্টের ‘লস্ট এন্ড ফাউন্ড’ শাখায় জানাতে হবে।
সৌদি সরকারের আইন অনুযায়ী লাগেজে নেশা জাতীয় ঔষধ, তামাক পাতা, জর্দা, গুল, শুটকি, গুড়, রান্না করা খাবার, পঁচনশীল দ্রব্য প্রভৃতি বহন করা যাবে না। এটি কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। এ জাতীয় দ্রব্য বহনের কারণে আইনি ঝামেলার শিকার হতে হয় এবং এতে দেশের ভাবমূর্তিও নষ্ট হয়। হজ সফরে হজযাত্রীর পাসপোর্ট মোয়াল্লেম অফিস হতে ফেরত নেয়া হলে পরবর্তীতে সব দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট হজযাত্রীকে বহন করতে হবে। প্রত্যেক হজযাত্রীর খাবার বাবদ প্রতিদিন ৩৫ সৌদি রিয়াল (কম/বেশি) ব্যয় হতে পারে। সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সৌদি রিয়াল হজযাত্রীকে সাথে নিতে হবে এবং নিজ দায়িত্বে খাবার ক্রয় করতে হবে। তবে যদি এজেন্সি কর্তৃক এই অর্থ হজযাত্রীর নিকট হতে গ্রহণ করা হয় সেক্ষেত্রে সৌদি সরকারের অনুমোদিত ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠান খাবার সরবরাহ করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক বিধি-বিধান অনুসরণপূর্বক প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা হজের সময় সঙ্গে নেয়া যাবে। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় হতে সরবরাহকৃত হজ ও ওমরাহ সহায়িকা পুস্তিকাটি বা অনুরূপ কোনো বই সাথে নিলে হজের আনুষ্ঠানিকতা ও দোয়া-দরূদ সম্পর্কে জানা যাবে।
ঢাকা হতে সৌদি আরবে গমনকারী হজযাত্রীদের বোর্ডিং ও ইমিগ্রেশন আশকোনা হজক্যাম্পে এবং সৌদি প্রান্তের ইমিগ্রেশন মক্কা রুট ইনিশিয়েটিভস সার্ভিসের আওতায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সম্পন্ন করা হবে।
সৌদি বিমানবন্দরে অবতরণের পর চুক্তিকৃত পরিবহণ কোম্পানীর গাড়ি হজযাত্রীদেরকে সংশ্লিষ্ট হোটেল বা বাড়িতে পৌঁছে দেবে। মক্কা রুট ইনিশিয়েটিভস সার্ভিসের অধীনে চেকইন লাগেজও সৌদিতে অবতরণকারী বিমানবন্দর হতে সরাসরি হজযাত্রীর হোটেল বা বাড়িতে পৌঁছে যাবে। সৌদি আরবে হজযাত্রীদেরকে সৌদি হজ ও উমরাহ মন্ত্রণালয় প্রদত্ত নুসুক কার্ড, হজযাত্রী ও তাঁবুর তথ্য সংবলিত মোয়াল্লেম কার্ড, হোটেলের কার্ড ও বাংলাদেশ থেকে দেয় হজযাত্রীর পরিচয়পত্র সার্বক্ষণিক সাথে রাখতে হবে। নুসুক কার্ড ব্যতীত কোনো হজযাত্রী হোটেলের বাইরে বের হলে সৌদি পুলিশ গ্রেফতার করতে পারে। নুসুক কার্ড সতর্কতার সাথে ব্যবহার করতে হবে যেন তা হারিয়ে না যায় কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত না নয়।
সৌদি আরবে অবস্থানকালে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিক্ষোভ প্রদর্শন, ভিক্ষাবৃত্তিসহ সকল প্রকার অনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্যথায়, আইন ভঙ্গের দায়ে জেল-জরিমানার সম্মুখীন হতে হবে। সৌদি সরকারের পুলিশ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য বা হজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তির কাজে বাঁধা প্রদান কিংবা তাদের সাথে কোনোরূপ অসৌজন্যমূলক আচরণ করা যাবে না। এরূপ কাজের জন্য শাস্তির আশঙ্কা থাকবে। সৌদিতে অসুস্থ হলে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক মক্কা, মদিনা ও জেদ্দায় স্থাপিত মেডিকেল সেন্টার হতে হজযাত্রীরা বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ ও সরবরাহ থাকা সাপেক্ষে ঔষুধ নিতে পারবেন। এছাড়া প্রয়োজনে সৌদি সরকারি হাসপাতাল থেকেও চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
হজ কাফেলাবদ্ধ ইবাদত। সৌদি সরকারের নিয়মানুসারে প্রতি ৪৬ জন হজযাত্রীর জন্য একজন অভিজ্ঞ হজ গাইড থাকবে। সুষ্ঠু ও সাবলীলভাবে হজ পালনের জন্য হজ গাইডের কথা মেনে চলতে হবে। হজগাইডকে না জানিয়ে কোথাও যাওয়া যাবে না। মিনা, আরাফাহ, মুজদালিফা ও জামারায় হজের যেসকল আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে তা অবশ্যই হজগাইডের সাথে দলবদ্ধভাবে সম্পন্ন করতে হবে। বিশেষ করে জামারায় পাথর বা কংকর নিক্ষেপের জন্য গমনাগমনের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই একা যাওয়া যাবে না। একা গমনাগমন করলে পথ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। মক্কায় অবস্থানকালে কোথাও পথ হারিয়ে ফেললে আতঙ্কিত না হয়ে বাংলাদেশ হজ মিশন অফিস, মক্কায় গমন করতে হবে। প্রায়াজনে ‘লাব্বাইক’ মোবাইল অ্যাপের এসওএস (SOS) বাটনে ক্লিক করতে হবে বা হটলাইন নম্বর-০০৯৬৬৮০০১১৬০০২৯ নম্বরে ফোন করতে হবে। সৌদি আরবে একা চলাফেরার পরিবর্তে দলগতভাবে চলাফেরা, পাহাড়-পর্বতে আরোহণ হতে বিরত থাকা এবং রাস্তা পারাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক।
ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হজ পোর্টাল www.hajj.gov.bd হতে কিংবা ১৬১৩৬ নম্বরে ফোন করে কিংবা লাব্বাইক মোবাইল অ্যাপ হতে হজ সংক্রান্ত তথ্যাদি জানা। সৌদি অবস্থানকালে হজযাত্রীর পরিচয়পত্রের অপর পৃষ্ঠায় প্রদর্শিত নম্বরে ফোন করেও তথ্য জানা কিংবা যেকোনো বিষয়ে অভিযোগ বা পরামর্শ দেওয়া যাবে। হজ পোর্টালের (www.haji.gov.bd) মাধ্যমে অনলাইনে সেবা সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ প্রদান করা হবে। অভিযোগের শুনানিতে অভিযোগকারীকে প্রয়োজনীয় প্রমাণাদি উপস্থাপন করতে হবে। সকল অভিযোগ ই-হজ সিস্টেমে সংরক্ষিত থাকবে। হজের সফরে মৃত্যুবরণকারী হজযাত্রীর ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ সৌদি সরকারের বিধান অনুযায়ী লাশ সৌদি আরবেই দাফন করেন। এ বিষয়ে মৃত ব্যক্তির পরিবার বা স্বজনদের আপত্তি উত্থাপনের কোনো সুযোগ নেই। হজ শেষে মৃত্যু সনদ হজ অফিস, ঢাকার মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির পরিবার বা ওয়ারিশ বা বৈধ প্রতিনিধির নিকট হস্তান্তর করা হয়ে থাকে।
হজ শেষে দেশে ফেরার সময় লাগেজে নির্ধারিত ওজনের বেশি মালামাল নেয়া যাবে না। লাগেজে জমজম পানি বহনে সৌদি সরকারের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পানিসহ অবৈধ মালামাল লাগেজে বহন করা যাবে না। দেশে প্রত্যাবর্তনের সময় অবতরণকারী বিমানবন্দর হতে প্রত্যেক হাজীকে পাঁচ লিটার জমজমের পানি সরবরাহ করা হবে।
হজ ফরজ ইবাদত। এর অত্যধিক গুরুত্ব ও ফজিলতের কারণে প্রত্যেক ইমানদার মুসলমান হজ পালনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা লালন করেন। সুষ্ঠু, সাবলীল ও শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে হজ পালনের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা জরুরি। হজের বিধি-বিধানের পাশাপাশি সৌদি ও বাংলাদেশ সরকারের আরোপিত বিধি-নিষেধ সম্পর্কে সম্যক অবহিত থাকলে হজ পালন সহজ ও মসৃন হবে।
লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়
পিআইডি ফিচার



