কোরবানির ঈদে স্বস্তির বার্তা: দেশীয় পশুর প্রাচুর্যে প্রস্তুত বাংলাদেশ
লেখক মোঃ মামুন হাসান
প্রকাশিত হয়েছে : ২১ মে ২০২৬, ১:৪২ পূর্বাহ্ণ
পবিত্র ঈদুল আযহা মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। আত্মত্যাগ, আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য এবং মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের মহিমান্বিত শিক্ষাই এ উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য। হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর মহান ত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করে প্রতি বছর মুসলমানরা পশু কোরবানির মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি নিজেদের ভালোবাসা, বিশ্বাস ও আত্মসমর্পণের বহিঃপ্রকাশ ঘটান। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং ত্যাগের চেতনায় উদযাপিত এ উৎসব সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধকে আরও সুদৃঢ় করে তোলে।
ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি ঈদুল আযহাকে কেন্দ্র করে দেশে গড়ে ওঠে বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। কোরবানির পশু পালন, বিক্রয় ও সরবরাহকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন লাখো খামারি, পশু ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, হাট ইজারাদার, কসাই, চামড়া ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা অস্থায়ী ও স্থায়ী পশুহাটগুলোতে ঈদের আগে সৃষ্টি হয় ব্যাপক বাণিজ্যিক প্রাণচাঞ্চল্য। একই সঙ্গে কোরবানির পশুর চামড়াকে কেন্দ্র করে চামড়া শিল্পেও তৈরি হয় বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, যা দেশের রপ্তানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ফলে ঈদুল আযহা শুধু ধর্মীয় উৎসবই নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমি চালিকাশক্তি হিসেবেও বিবেচিত।
আসন্ন ঈদুল আযহা ২০২৬ উপলক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে বহুমাত্রিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে, যাতে উৎসবটি শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হতে পারে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় পর্যাপ্ত কোরবানির পশুর সরবরাহ নিশ্চিত করতে খামারিদের সহায়তা, পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং অবৈধ পশু আমদানি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বাস্থ্যসম্মত ও যানজটমুক্ত পশুহাট ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপিতে এ খাতের অবদান ১ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ১৯ শতাংশ। কৃষিজ জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৫৪ শতাংশে। প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ১৯৭১ সালে দেশে প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন দুধ উৎপাদিত হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ১৫৫ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। একইভাবে মাংস উৎপাদন ৫ লাখ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ৮৯ লাখ মেট্রিক টনে এবং ডিম উৎপাদন ১৫০ কোটি থেকে বেড়ে প্রায় ২ হাজার ৪৪০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে।
সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস কনফারেন্সে জানানো হয়, ২০২৬ সালের ঈদুল আযহায় দেশে প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি গরু ও মহিষ, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল ও ভেড়া এবং অন্যান্য প্রজাতির ৫ হাজার ৬৫৫টি পশু। বিপরীতে সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি পশু। ফলে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, যা কোরবানির পশু উৎপাদনে দেশের স্বয়ংসম্পূর্ণতার ইতিবাচক দিক তুলে ধরে।
বিভাগভিত্তিক হিসেবে কোরবানির পশু সরবরাহে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ। সেখানে প্রায় ৪৩ লাখ ৫ হাজার ৬২৮টি পশু প্রস্তুত করা হয়েছে, যা সম্ভাব্য চাহিদার তুলনায় প্রায় ১৮ লাখ ৭০ হাজার বেশি। এছাড়া রংপুর বিভাগ ও খুলনা বিভাগেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পশু উদ্বৃত্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে ময়মনসিংহ বিভাগ ও সিলেট বিভাগে চাহিদার তুলনায় পশুর প্রাপ্যতা বেশি থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জনসংখ্যা ও নগরায়ণজনিত কারণে ঢাকা বিভাগ ও চট্টগ্রাম বিভাগে কোরবানির পশুর তুলনামূলক ঘাটতির সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকা বিভাগে সম্ভাব্য চাহিদা ২১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৬৯টি হলেও প্রাপ্যতা প্রায় ১৪ লাখ ৪৩ হাজার ৯৪২টি, ফলে প্রায় ৭ লাখ ১৪ হাজার ৯২৭টি পশুর ঘাটতি হতে পারে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিভাগে সম্ভাব্য চাহিদার তুলনায় প্রায় ৫০ হাজার ২৭৯টি পশুর ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে। তবে রাজশাহী বিভাগ, রংপুর বিভাগ ও খুলনা বিভাগের উদ্বৃত্ত পশু সরবরাহের মাধ্যমে এ ঘাটতি পূরণ সম্ভব হবে বলে সরকার আশা করছে। গত ঈদুল আযহায় দেশে প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয় এবং প্রায় ৩৩ লাখ ১০ হাজার পশু উদ্বৃত্ত থাকে। এ তথ্য প্রমাণ করে, দেশীয় খামারিরা এখন জাতীয় চাহিদা পূরণে সক্ষমতা অর্জন করেছে এবং কোরবানির সময় বিদেশি পশুর ওপর নির্ভরশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
কোরবানির পশু দ্রুত মোটাতাজা করতে স্টেরয়েড, ক্ষতিকর হরমোন ও অননুমোদিত ওষুধের ব্যবহার রোধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে গবাদিপশু হৃষ্টপুষ্টকরণ বিষয়ে ৭৩ হাজার ৪৬৫ জন খামারিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উঠান বৈঠক, লিফলেট ও পোস্টার বিতরণ এবং খামার পরিদর্শনের মাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। অবৈজ্ঞানিকভাবে পশু মোটাতাজাকরণ বন্ধে সরকার ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমও জোরদার করেছে। কোরবানির পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে দেশের বিভিন্ন পশুহাটে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম দায়িত্ব পালন করবে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন ২৬টি পশুহাটে ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম কাজ করবে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় মনিটরিং টিম, বিশেষজ্ঞ মেডিকেল টিম, কন্ট্রোল রুম ও ভ্রাম্যমাণ আদালত সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করবে।
সরকারের ভাষ্যমতে কোরবানির পশু পরিবহনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পশুবাহী যানবাহনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং পথে চাঁদাবাজি ও হয়রানি রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর থাকবে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রাণিকল্যাণ আইন-২০১৯ অনুযায়ী পশুর প্রতি মানবিক আচরণ ও নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি সীমান্তপথে অবৈধ গবাদিপশু প্রবেশ ঠেকাতে কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে। ডিজিটাল সেবার বিস্তারের ফলে অনলাইনে পশু বিক্রিও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। গত ঈদে ৪০৯টি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ৬১৪টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক পেজের মাধ্যমে প্রায় ৮৫ হাজার ৬২৬টি পশু বিক্রি হয়, যার লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ হাজার ৯৮৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এ বছরও অনলাইন বিক্রয় কার্যক্রম চালু থাকবে এবং তথ্য ও সহায়তার জন্য হটলাইন নম্বর ১৬৩৫৮ সচল রাখা হবে। কোরবানির পর পশুবর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও চামড়া সংরক্ষণকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে দ্রুত বর্জ্য অপসারণ, ব্লিচিং পাউডার ও বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ সরবরাহের উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া চামড়ার মান রক্ষা ও অপচয় কমাতে ১৫ হাজার ৪৪৪ জন পেশাদার এবং ২২ হাজার ৯১৮ জন মৌসুমি কসাইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে সরকারের সার্বিক প্রস্তুতি, প্রাণিসম্পদ খাতের উৎপাদন সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ের সমন্বিত কার্যক্রম থেকে স্পষ্ট যে, আসন্ন ঈদুল আযহায় কোরবানিযোগ্য পশুর কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই। বরং দেশীয় উৎপাদনের সক্ষমতা নতুন আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। একসময় কোরবানির মৌসুমে বিদেশি পশুর ওপর নির্ভরতা থাকলেও বর্তমানে দেশীয় খামারিদের উৎপাদিত পশুই জাতীয় চাহিদা পূরণে সক্ষমতা অর্জন করেছে। এটি শুধু প্রাণিসম্পদ খাতের অগ্রগতির প্রতিফলন নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কৃষিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার ইতিবাচক উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর তদারকি, আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা, খামারিদের প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রম দেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে। পাশাপাশি নিরাপদ পশু পরিবহন, স্বাস্থ্যসম্মত পশুহাট ব্যবস্থাপনা, অনলাইন পশু বিক্রি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও চামড়া সংরক্ষণে নেওয়া উদ্যোগ ঈদ আয়োজনকে আরও সুশৃঙ্খল ও জনবান্ধব করতে সহায়ক হবে।
সরকারের পাশাপাশি খামারি, ব্যবসায়ী, স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই ঈদুল আযহা ২০২৬-কে আরও শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও সফল করে তুলতে পারে। এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ একদিকে দেশীয় প্রাণিসম্পদ খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে কোরবানির ধর্মীয়, সামাজিক ও মানবিক তাৎপর্যকে আরও গভীর ও অর্থবহ করে তুলবে।
লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়
পিআইডি ফিচার



