প্রতিবন্ধী শিশুর সুরক্ষার দায়িত্ব পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সবার
এমরানা আহমেদ
প্রকাশিত হয়েছে : ৩১ মার্চ ২০২৬, ৯:৫৭ পূর্বাহ্ণ
প্রতিবন্ধী শিশুদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা একটি সভ্য সমাজের অন্যতম দায়িত্ব। প্রতিবন্ধী শিশুরা আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারা শারীরিক, মানসিক বা বুদ্ধিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বৈষম্য অবহেলা ও সহিংসতার ঝুঁকির মধ্যে থাকে। আইন অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাস্বাস্থ্যসেবা এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন প্রয়োজন। জন্মনিবন্ধন না করার মধ্য দিয়ে প্রতিবন্ধী অনেক শিশুর জীবনের প্রথম থেকেই বঞ্চনার শুরু হয়। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির কারণে তারা সামাজিক সেবা ও আইনগত নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হয়। সঠিক সহায়তা ও ভালোবাসার মাধ্যমে তারা নিজেদের সম্ভাবনা পুরোপুরি বিকশিত করতে পারে। তাদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজেরই মানবিক দায়িত্ব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ১ কোটি ৭০ লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, এর মধ্যে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৩৩ লাখ। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বিশেষ করে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজে নানারকম সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। বিশেষ করে মেয়ে প্রতিবন্ধীরা নানারকম নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার নিশ্চিত করনের পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। আইনটিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার নিশ্চিত করণে কমিটি গঠন,গণ পরিবহণে আসন সংরক্ষণ এবং সকল গণস্থাপনায় প্রবেশগম্যতার বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে।
ইউনিসেফের সহযোগিতায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত জাতীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জরিপ (এনএসপিডি) ২০২১-এর তথ্যানুযায়ী, প্রতিবন্ধী শিশুদের (৫-১৭ বছর বয়সি) মধ্যে মাত্র ৬৫ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং মাত্র ৩৫ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নথিভুক্ত আছে। সে হিসেবে মোট ৬০ শতাংশ প্রতিবন্ধী শিশু আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। এমন দৃশ্য আমাদের জন্য অপ্রত্যাশিত, কারণ প্রতিবন্ধী শিশুরা এ সমাজেরই অংশ। আর দশটি স্বাভাবিক শিশুর মতোই প্রতিবন্ধী শিশুরও শিক্ষা লাভের অধিকার আছে।
এজন্য সমাজের মূল ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রমে ভর্তির সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এটি যখন বিভিন্ন কারণে সম্ভবপর হচ্ছে না, তখন প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষায়িত স্কুলগুলোয় প্রতিবন্ধী শিশু ভর্তি কার্যক্রমের ওপর জোর দিতে হবে। কারণ প্রতিবন্ধী স্কুল থাকার পরও স্কুলগুলোয় শিক্ষার্থী ভর্তির হার আশানুরূপ নয়। বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের যথাযথ বিকাশে এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। বিবিএস প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে জরিপ করেছে। জরিপে প্রতিবন্ধী শিশুরা বেড়ে উঠার সময় কত ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় তা তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী শিশুদের মধ্যে কতজন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত নতুন এ তথ্য তা তুলে ধরেছে। রিপোর্টে প্রকাশিত তথ্য-উপাত্ত বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিশ্চিতের জন্য পরিকল্পনা ও উদ্যোগ প্রণয়নে সরকারকে সহায়তা করবে।
বর্তমানে ৬৪ জেলায় একটি করে সমন্বিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্কুল, সাতটি শ্রবণপ্রতিবন্ধী স্কুল, পাঁচটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্কুল, ৫৬টি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী স্কুল রয়েছে। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী স্কুলের মধ্যে সুইড বাংলাদেশ পরিচালিত ৪৮টি, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন পরিচালিত সাতটি ইনক্লুসিভ স্কুল এবং প্রয়াস পরিচালিত একটি অটিস্টিক স্কুল রয়েছে। এছাড়া রাজধানীর মিরপুরে ‘জাতীয় বিশেষ শিক্ষা কেন্দ্র’ রয়েছে। প্রতিবন্ধী শিশুর জন্য গৃহীত উদ্যোগগুলো বিশেষায়িত ও আলাদা। এ ধরনের উদ্যোগগুলো মূলধারার কর্মসূচি ও সেবার আওতার বাইরে থেকে যায়। এক্ষেত্রে ধীরগতির উন্নয়ন সত্ত্বেও পরিমার্জন এবং সামাজিক সচেতনতার কারণে পরিবর্তনগুলো লক্ষ করা যায়। বর্তমানে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিদ্যালয়ে প্রবেশাধিকারের বাড়তি সুযোগ এবং দক্ষতার বিকাশ ও চাকরির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বস্তুত প্রতিবন্ধিতা নিয়ে বেড়ে উঠা শিশুদের সর্বোচ্চ বিকাশের জন্য শৈশবে দ্রুত শনাক্ত করা ও যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া গুরুত্বপূর্ণ। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করাও দরকার, যেখানে পরিবার ও সেবা প্রদানকারীরা এ শিশুদের জীবনের সবখানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণে সহায়তা করবে। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রতিবন্ধী শিশুদের বৃহৎ আকারে অন্তর্ভুক্তি প্রয়োজন। বিশেষভাবে সক্ষম শিশুরা উপযুক্ত শিক্ষা পেলে সমাজে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। তাই প্রতিবন্ধী শিশুদের কথা ভেবে বিশেষায়িত স্কুলগুলোর কার্যক্রম বৃদ্ধির পাশাপাশি স্কুলগুলোয় উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।
সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সুরক্ষার লক্ষ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সমাজসেবা অধিদফতরের মাধ্যমে দুইটি পৃথক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্প দু’টি হচ্ছে, চাইল্ড সেনসিটিভ সোস্যাল প্রটেকশন ইন বাংলাদেশ (সিএসপিবি) প্রকল্প এবং সার্ভিসেস ফর দ্যা চিলড্রেন এট রিস্ক। প্রটেকশন অব চিলড্রেন এ্যাট রিস্ক (পিকার) প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় ইউনিসেফ-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় সমাজসেবা অধিদপ্তর ‘চাইল্ড সেনসিটিভ সোস্যাল প্রটেকশন ইন বাংলাদেশ’ (সিএসপিবি) শীর্ষক প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্প এলাকায় নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন এবং শোষণ প্রতিরোধকল্পে ইতিবাচক ও সহায়ক সামাজিক আদর্শের অনুশীলন, উন্নয়ন ও সুদৃঢ় করা। শিশু অধিকার সনদ ও আন্তর্জাতিক চুক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইনি কাঠামো এবং বিশেষ শিশু নীতি গ্রহণ ও দেশের সকল শিশু বিশেষ করে দুস্থ শিশুদের কল্যাণ সাধন। ইউনাইটেড ন্যাশনস্ ডেভলাপমেন্ট এসিসটেন্স ফের্মওয়ার্ক (ইউএনডিএএফ) চিহ্নিত ২০টি জেলা। জামালপুর, নেত্রকোনা, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, রংপুর, গাইবান্ধা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা জেলা। এছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগীয় শহর।
সরকার পরিচালিত স্কুলগুলোয় দক্ষ শিক্ষকের মাধ্যমে পাঠদান করা হলেও অভিভাবকরা তাদের বিশেষভাবে সক্ষম শিশুটিকে প্রতিবন্ধী স্কুলে ভর্তি করাতে ইচ্ছুক হন না। এক্ষেত্রে সরকারি স্কুলে পড়াশোনার মান কেমন সেটি নিয়ে যেমন তারা শঙ্কামুক্ত নন, তেমনিভাবে এমপিওভুক্তিসহ বিভিন্ন দাবিতে বেসরকারি প্রতিবন্ধী স্কুলের শিক্ষকদের আন্দোলনের বিষয়টিও আমরা অতীতে দেখতে পেয়েছি। যার ফলে প্রতিবন্ধী স্কুলগুলো ভালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি-না সে বিষয়টি নিয়ে সন্দিহান হওয়াটাও স্বাভাবিক। একটি স্বাভাবিক শিশুকে পড়ানোর চেয়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুকে পড়ানো অনেক বেশি কষ্টের। অনেক বেশি পরিশ্রমের। যে কারণে স্বাভাবিক স্কুলে প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম সঠিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না। এজন্য প্রতিবন্ধী স্কুলগুলো যেন সঠিকভাবে পরিচালিত হয় সেটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে দেখভাল করতে হবে। প্রতিবন্ধী শিশুরা যেসব বিদ্যালয়ে পড়ে, সেখানে তাদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে। তাদের উপযোগী বিদ্যালয়ের ঘর, দরজা, সিঁড়ি, টয়লেট, বেঞ্চ, টেবিল তৈরি করতে হবে। সেই সঙ্গে প্রতিবন্ধী স্কুলের সুযোগ-সুবিধার কেউ যেন অপব্যবহার না করতে পারে সেটিও পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের।
এসব স্কুলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার উপযোগী পরিবেশ পাচ্ছে কি-না সেটি যাচাই করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে যারা অন্য কোনো চাকরিতে না গিয়ে প্রতিবন্ধী শিশুদের পড়ানোর গুরুদায়িত্ব পালন করছেন তাদের কথাও বিবেচনা করতে হবে। নিকট অতীতের মতো প্রতিবন্ধী স্কুলের শিক্ষকরা যদি রাজপথে নেমে আন্দোলন করেন, তাহলে তা এ স্কুলগুলোর দুরবস্থাকেই তুলে ধরবে। তাই প্রতিবন্ধী স্কুলগুলোর প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ দৃষ্টি প্রয়োজন। স্কুলগুলোয় অভিভাবকরা যেন প্রতিবন্ধী শিশুদের পাঠাতে উৎসাহী হন সেটি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবন্ধী শিশুরা সমাজের জন্য বোঝা নয়, তাদের সঠিকভাবে শিক্ষিত করা গেলে তারা সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে, এ দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে অভিভাবকদের প্রথমে সচেতন হতে হবে।
প্রতিবন্ধী স্কুলগুলোর প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ দৃষ্টি প্রয়োজন। স্কুলগুলোয় অভিভাবকরা যেন প্রতিবন্ধী শিশুদের পাঠাতে উৎসাহী হন সেটি নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবন্ধী শিশুরা সমাজের জন্য বোঝা নয়, তাদের সঠিকভাবে শিক্ষিত করা গেলে তারা সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে, এ দৃষ্টিভঙ্গি ধারণ করে অভিভাবকদের প্রথমে সচেতন হতে হবে।
#



