তথ্য অধিকার: সুশাসন, স্বচ্ছতা ও নাগরিক ক্ষমতায়নের ভিত্তি
মোঃ নাবিল তাহমিদ
প্রকাশিত হয়েছে : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ৬:০৭ অপরাহ্ণ
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিকের জানার অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের কার্যক্রম, নীতি ও সেবা সম্পর্কে তথ্য জানার সুযোগ নিশ্চিত না হলে নাগরিকের অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষাপটে তথ্য অধিকার আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশেও তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করতে ২০০৯ সালে “তথ্য অধিকার আইন” প্রণয়ন করা হয়, যা সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য জনগণের কাছে উন্মুক্ত করার আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে।
তথ্য অধিকার কেবল একটি প্রশাসনিক ধারণা নয়। এটি গণতন্ত্র, সুশাসন, জবাবদিহি এবং নাগরিক ক্ষমতায়নের একটি মৌলিক উপাদান। রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার সম্পর্ককে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে তথ্য অধিকার অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। তথ্য অধিকার বর্তমানে বিশ্বজুড়ে একটি স্বীকৃত মানবাধিকার হিসেবে গণ্য করা হয়। কারণ তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অংশগ্রহণমূলক শাসন এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকে শক্তিশালী করে। জাতিসংঘের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র (১৯৪৮)- এর ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, প্রত্যেকেরই কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ ছাড়া মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। এই স্বাধীনতার মধ্যে “যেকোনো মাধ্যমে এবং রাষ্ট্রীয় সীমানা নির্বিশেষে তথ্য ও ধারণা অনুসন্ধান করা, গ্রহণ করা এবং পৌঁছে দেওয়া” অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিটি নাগরিকের চিন্তা, বিবেক ও বাক্-স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, যা মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। এই অনুচ্ছেদের অধীনে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৯-এ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও তথ্য জানার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই সাংবিধানিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই তথ্য অধিকার আইন প্রণীত হয়েছে। ফলে তথ্য অধিকারকে একদিকে আন্তর্জাতিকভাবে মানবাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয় অন্যদিকে জাতীয় পর্যায়ে এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ না থাকলে নাগরিকরা রাষ্ট্রের কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত হতে পারে না এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে পড়ে। তাই তথ্য অধিকারকে গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য ভিত্তি বলা হয়। বাংলাদেশে তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্র একসময় অত্যন্ত সীমিত ছিল। সরকারি দপ্তরগুলোতে তথ্যকে অনেক সময় গোপনীয় হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং সাধারণ নাগরিকের পক্ষে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠত। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাধাগ্রস্ত হতো এবং অনেক ক্ষেত্রে নাগরিকরা তাদের প্রাপ্য অধিকার সম্পর্কে অবগত হতে পারতেন না।
বাংলাদেশে তথ্য অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বেশ কয়েকটি আইন ও বিধিমালা কার্যকর রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯। এই আইনের মাধ্যমে নাগরিকদের সরকারি ও নির্দিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। তথ্য প্রাপ্তি সংক্রান্ত বিধিমালা, ২০০৯ বিধিমালায় তথ্য চাওয়ার আবেদন প্রক্রিয়া, ফি, সময়সীমা ইত্যাদি নির্ধারণ করা হয়েছে। তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা প্রবিধিমালা, ২০১০ এ সরকারি প্রতিষ্ঠানে তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া তথ্য প্রকাশ ও প্রচার প্রবিধানমালা, ২০১০ এ প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট কিছু তথ্য স্বপ্রণোদিতভাবে প্রকাশ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই আইন ও বিধিমালার মাধ্যমে তথ্যপ্রাপ্তির একটি সুসংগঠিত কাঠামো গড়ে উঠেছে।
২০০৯ সালে তথ্য অধিকার আইন প্রণীত হওয়ার মাধ্যমে এই পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। এই আইনের ফলে নাগরিকরা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারি ও সংশ্লিষ্ট বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে তথ্য চাইতে পারেন। আইনটি বাস্তবায়নের জন্য সরকার একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে তথ্য কমিশন প্রতিষ্ঠা করে, যা তথ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে। কেউ মিথ্যা বা বিভ্রান্তিমূলক তথ্য সরবরাহ করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাও তথ্য কমিশনের অন্যতম কাজ। তথ্য কমিশন তথ্য অধিকার সংরক্ষণে গবেষণা করে এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করে থাকে। তথ্য কমিশন তথ্য অধিকার সংক্রান্ত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক দলিলের সাথে বিদ্যমান আইনের বৈসাদৃশ্য পরীক্ষা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা সরকারকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকে। তাছাড়াও তথ্য অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন ও প্রশাসনিক নির্দেশনা প্রণয়নের বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করে।
বাংলাদেশ সরকার তথ্য অধিকার বাস্তবায়নে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জাতীয় তথ্য বাতায়ন ও বিভিন্ন সরকারি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনেক তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করা হচ্ছে। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং অধিদপ্তর তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটেও তথ্য প্রকাশ করছে এবং তথ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করার জন্য বিভিন্ন নির্দেশিকা অনুসরণ করছে। এর ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নাগরিক সেবার মান উন্নত হয়েছে। প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে, যারা তথ্যপ্রাপ্তির আবেদন গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করেন। সরকারি কর্মকর্তা এবং নাগরিকদের মধ্যে তথ্য অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে বার্ষিক প্রতিবেদন, প্রকল্প তথ্য, বাজেট এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করছে।
তথ্য অধিকার নিশ্চিত করার ফলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয়। তথ্য উন্মুক্ত হলে প্রশাসনের কার্যক্রম জনগণের কাছে দৃশ্যমান হয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহার কমে। অন্যদিকে তথ্য গোপন থাকলে দুর্নীতির সুযোগ বাড়ে। তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ নাগরিককে সচেতন করে এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি করে। সরকারি প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বা বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য জানা থাকলে নাগরিকরা তাদের প্রাপ্য সুবিধা সম্পর্কে সচেতন হতে পারে। আইন, নীতিমালা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তথ্য নাগরিকদের আইনের শাসনের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি করে।
তথ্য অধিকার আইন নাগরিকের যেকোনো সরকারি/বেসরকারি দপ্তরে তথ্য চাওয়ার অধিকার দিয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি স্বরূপ তথ্য, কপিরাইট বা বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সম্পর্কিত তথ্য, আদালত অবমাননার শামিল বিচারাধীন বিষয় সম্পর্কিত কোনো তথ্য, ইত্যাদি প্রকাশ বা প্রদান তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ এর ৭ ধারা অনুযায়ী বাধ্যতামূলক নয়। এ ধারার অধীন কোনো তথ্য প্রদান স্থগিত রাখার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তথ্য কমিশনের পূর্বানুমোদন গ্রহণ করতে হবে।
তথ্য অধিকার আইনের ৯ ধারা অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ২০ (বিশ) দিনের মধ্যে তথ্য প্রদান করতে হবে। তবে তথ্য প্রদানের সাথে একাধিক তথ্য প্রদান ইউনিট জড়িত থাকলে ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে এবং চাহিত তথ্য কোনো ব্যক্তির জীবন-মৃত্যু, গ্রেফতার এবং কারাগার হতে মুক্তি সম্পর্কিত হলে ২৪ (চব্বিশ) ঘন্টার মধ্যে তথ্য সরবরাহ করতে হবে।
তথ্য অধিকার আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য আরও কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন- গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়ে তথ্য অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করা যেতে পারে। তথ্য ব্যবস্থাপনা ও তথ্যপ্রদানের বিষয়ে কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া। তথ্য অধিকার আইনের বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হচ্ছে তা নিয়মিত মূল্যায়ন করলে এই আইনের কার্যকারিতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
তথ্য অধিকার আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এটি নাগরিকের ক্ষমতায়ন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম হাতিয়ার। বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন প্রণয়ন এবং এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রশাসনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নাগরিকের অংশগ্রহণের সুযোগ প্রসারিত হয়েছে। তবে তথ্য অধিকারকে আরও কার্যকর করতে হলে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হবে।
সরকার, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে তথ্য অধিকারকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। এর মাধ্যমে একটি জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ এবং অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যাবে, যা টেকসই উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের পথকে সুদৃঢ় করবে।
লেখক: সহকারী তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর বাংলাদেশ সচিবালয়, ঢাকা।
পিআইডি ফিচার



